ব্যর্থ প্রেমের গল্প – দূরত্ব

ব্যর্থ প্রেমের গল্প – দূরত্ব
লিখেছেনঃ নবনী নওশাদ অধরা

রোজকার দিনের মতো  আজও ফাইয়াজ রাতে তারাতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লো;সকাল সকাল ঘুম থেকে  উঠতে হবে বলে। কারন ফাইয়াজের অফিসের বস তাকে তারাতাড়ি অফিসে উপস্থিত  থাকতে বলেছে। ফাইয়াজ একটি আইটি প্রতিষ্ঠানের তিন বছর ধরে কাজ করছে।ফাইয়াজ কাজে  খুব সুদক্ষ, গুছিয়ে কথা বলতে পারে, দেখতে ও বেশ সুন্দর। সেই হিসেবে ফাইয়াজ অফিসের মুটোমুটি সবার কাছে জনপ্রিয় ;এমনকি বস ও তাকে পছন্দ করে । আজ ফাইয়াজের ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হয়েছে ;তাই ফ্রেস হয়ে অবিলম্বে মায়ের তৈরি নাস্তা না করে অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে  রওনা হলো।শহরের বহু প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে নিদিষ্ট সময়ের একটু পরেই ফাইয়াজ অফিসে পৌঁছালো । পরক্ষণেই সে কাজে মন দিলো।

কিছু দিন পর অফিসের ফাইল আটকে যাওয়ার ফাইয়াজ ও তার সহকর্মী  অফিসের সমস্যা মেটাতে সরকারি আইটি প্রতিষ্ঠানে যাওয়া লাগবে।সেই উদ্দেশ্য রওনা হলো ফাইয়াজ এবং প্রতিম সাহেব।  সমস্যা সমাধানের এক পর্যায়ে ফাইয়াজ তার সবচেয়ে কাছের ছোটবেলার বন্ধু সুনীলের সাথে দেখা হলো। সে ও এই অফিসের একজন কর্মকর্তা। দুইজনই কথা বলা শুরু করলো যেন শেষই হয় না। কথার মধ্যখানে   সুনীল বললো তোকে ত বলাই হইনি সামনের মাসের ২ তারিখে আমার বোনের বিয়ে তুই কিন্তু অবশ্যই আসবি।তোকে কাছে পেয়ে গেলাম ভালোই হলো অন্য বন্ধুদেরকে বলা হয়ে গেছে। অনেক দিন আমরা সব বন্ধুরা মিলে আড্ডা দেই না। বিয়ের সুবাদে সবাই একসাথে হবো ভালো লাগবে।  ফাইয়াজ বললো আসার চেষ্টা করবো ;কিন্তু তুই এখনো বিয়ে করিস না কেন? শুনলাম তোর নাকি সুন্দরী প্রমিকা আছে? হুট করে প্রতিম সাহেব এসে বলে উঠলো ফাইয়াজ সাহেব যে কাজটা আটকে ছিলো আজ তা সমাধান হলো। ফাইয়াজ বললো বেশ তো। কথা না বাড়িয়ে পরে সুনীল কে বললো বন্ধু আজ আসি।  ইনশাআল্লাহ দেখা হবে তোর বোনের বিয়েতে।       

সুনীলের বাসা হলো  শহর থেকে একটু দূরে মানে গ্রামের পাশে। তবুও এরা গ্রাম ও শহর দুটোরই  সুবিধা পায়।সুনীলের বোন কেয়ার বিয়ে আজ। সুনীল আজ বড়ই ব্যাস্ত বোনের বিয়ের যাবতীয় কাজ সামলাতে সামলাতে। হটাৎ করে কেয়ার সব বান্ধবীরা এসে হাজির। কেয়া অন্য মনষ্ক  হয়ে কাকে জানি খুজঁছিলো। কেয়ার সবথেকে ভালো বান্ধবী এবং হবু ভাবি হলো অনিশা। অনিশার আসতে একটু দেরি হলো। কেয়া অনিশাকে দেখে বেশ খুশি হলো। অনিশা খুব সুশ্রী, চঞ্চল, এবং প্রানবন্ত স্বভাবের একটা মেয়ে যা সুনীলকে বেশি আকৃষ্ট করে অন্যদিকে সনীল মানুষ হিসেবে সাদামাটা ও নরম স্বভাবের ছেলে। বিপরীত বৈশিষ্টের অধিকারী মানুষের প্রতি মানুষের অগ্রহ ও ভালোবাসা বেশি থাকে। 

সুনীল ও অনিশা একে অপরকে বছরখানেক ধরে ভালোবাসে।ওদের ভালোবাসা শুরু হয় ২ বছর আগে।  অনিশারা সুনীলদের বাসায় ভাড়া থাকে। 

অনিশা তখন কলেজে পড়ে আর সুনীল চাকরীর খুঁজছে। সুনীল  মেধাবী হওয়ায় খুব বেশি সময় লাগে নি। হটাৎ একদিন চাকরী পরিক্ষার রেজাল্ট বের হলো সুনীলের চকরী হয়েছে। তাই মিষ্টি নিয়ে অনিশাদের বাসায় গেল। কলিং বেল চাপার পর অনিশা দরজা খুলে তখন দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে।সুনীল অনিশাকে দেখেই ভালো লেগে গেল। অনিশা প্রায়ই ছাদে হাটতে যায় সুনীলের বোন কনার সাথে।অনিশা ছাদে যায় বলে আজকাল সুনীল ও ছাদে যায় আর কথা বলার চেষ্টা করে। এটা অনিশাও বুঝতে পারে যে সুনীল কিছু বলতে চায়। আজকাল অনিশার ও কেন জানি সাজতে খুব ভালো লাগে ;একটু পর পর আয়নার সামনে গিয়ে নিজেকে সাজাতে তার বেশ ভালোই লাগে।একদিন কেয়ার জ্বর হওয়ার অনিশা একাই ছাদে আসে তারমধ্যে সুনীল আগে থেকেই ছাদে। সুনীলকে দেখে অনিশা কিছুটা ইতস্তত বোধ করে চলে যাবে বাসায় নাকি থাকবে। ঐ দিকে সুনীল ভাবছে আজ আমাকে বলতেই হবে আমার মনের সব কথা। হটাৎ অনিশা চলে যাচ্ছিলো তা দেখে সুনীল অনিশাকে ডেকে বলে ;এই শুনো, তোমার নাম কি অনিশা।  অনিশা মাথা নাড়ালো। সুনীল আরো বলে তোমার কথা কেয়ার কাছ থেকে অনেক শুনেছি। একটা কথা বলবো ;অনিশা বললো জ্বি বলেন –

সুনীল কাপছে আর বলছে তোমাকে যেদিন দরজার সামনে দেখেছি সেদিন থেকেই তোমাকে আমার ভালোলাগে এবং এই কয়েক দিনে তোমাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। তোমার কি আমাকে ভালো লাগে? অনিশা কিছু না বলেই বাসায় চলে গেল। সুনীলের খুব ভয় পাচ্ছে অনিশা রেগে গেল নাতো। অনিশার বুক ধরফর করছে   তাহলে সত্যিই কি সুনীল আমাকে ভালোবাসে? যদি না ভালোবাসে তাহলে ছাদে এইসব বলতো না। অনিশার ও সুনীলকে ভালোলাগে। কারন ছেলেটা খুব সাদাসিধা আর খুব ভদ্র। কখনো বাজে ছেলেদের সাথে মেলামেশা করে না এবং রাত করে বাসায় আসে না। এমন ছেলে খুঁজে পাওয়া এখনের সময়ে খুব সহজ কথা না। অনিশা আরো কতো কি বলছে মনে মনে ফিসফিস কর। ঐদিন বাবা মার কথায় ও বুঝতে পারলাম সুনীলের প্রতি বাবা মার ও একটা ভালো লাগা কাজ করে। এইসব ভাবতে ভাবতে রাত হয়ে গেল। 

 পরের দিন সকালে সুনীল অফিসে নতুন জয়েন করতে যাবে আর অনিশা কেয়ার সাথে কথা বলতে যাবে বাসা থেকে বের হয়ে দুজনের আবারও দেখা। সুনীল বললো তুমি কিন্তু কিছুই জানাও নি।  উওরে অনিশা মুচকি হাসি দিয়ে বললো আমার কোন আপওি নেই বলে লজ্জা পেয়ে কেয়ার সাথে কথা না বলেই বাসায় চলে গেল অনিশ। সুনীল খুশিতে আত্মহারা। আজ তার দিকটা সকাল থেকেই সুন্দর মুহূর্ত দিয়ে শুরু। পরে সুনীল তার অফিসে যায়। কাজ শেষে বাসায় আসে পরে বোনকে আদর করে ডাকে লক্ষীসোনা বোন আমার  কেয়া কোথায় তুই? কেয়া বললো হটাৎ এতো আদর কি হয়েছে বলতো? সুনীল বললো আমার একটা ছোট উপকার করবি প্লিজ? কেয়া বললো উপকার করলে কি দিবি আমাকে বল? সুনীল বললো তোকে একটা বুড়ো টাকলু জামাই এনে দিবো এই বলে হাসতে লাগলো। ভাইয়া তুমি না! যাও তোমাকে কোন উপকারই করবো না। সুনীল বললো পাগলি বোন ফাজলামো করে বলেছি।  কেয়া বলে হয়েছে এবার বলো কি করতে হবে। সুনীল খুশি হয়ে বললো তুই আমাকে অনিশার নাম্বারটা একটু এনে দিবি। কেয়া মাকে ডেকে বললো মা তোমার বৌমা খুঁজে পেয়েছি। তার মধ্যে সুনীলের মা চলে এলো কি হয়েছে? সুনীল বললো কিছু না মা। মা চলে গেল। পরে কেয়া সুনীল কে বললো যে আমার ও ভাবি হিসেবে অনিশা পছন্দ হয়েছে। এই বলে অনিশা থেকে তার নাম্বার নিয়ে এলো আর সুনীল কে দিলো। সুনীল অনিশাকে ফোন দেয়। প্রথমবারই তাদের কথা বলা ফোনে দুজনই খুব লজ্জা পাচ্ছে।  এইভাবেই তাদের একসাথে পথচলা শুরু। 

 মাস দেড়েক পড় অনিশা আর সুনীল কে ছাদে একসাথে  কথা বলতে দেখে অনিশার মা বাবা দু’জন খুব রাগান্বিত হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করছে কি হচ্ছে এইসব অনিশা । আগে তো কোন দিন তোমাকে সুনীলের সাথে কথা বলতে দেখি নি?  কিছুদিন যাবৎ তুমি ফোনে ও কার সাথে জানি কথা বলছো তোমার মা তা লক্ষ্য করছে? এক্ষনি বল কি হয়েছে?অনিশা খুব সাহসী ও বটে বাবার প্রশ্নে উওর দিলো বাবা আমি আর সুনীল দুজন একে অপরকে পছন্দ করি।অনিশার বাবা আরো রাগান্বিত হয়ে সুনীলের মাকে বাসায় ডেকে আনে।   সুনীল ও অনিশার সম্পর্কের কথা নিয়ে সুনীল ও অনিশার পরিবারের কথা কাটাকাটি হয় এক পর্যায়ে সুনীলের মা সবকিছু সামলিয়ে নেয় এবং অনিশার বাাবা মাকে বুঝায় পরে শন্ত হয় অনিশার বাবা মা। আর তাদের সম্পর্ক মেনে নেয়। তবে এখনো শুভদিনের দিনক্ষন এখনো ঠিক হয় নি। আজ সুনীল ও অনিশা মহা খুশি।  তাদের ভালোবাসা পূর্নতা পেতে যাচ্ছ। অনিশার বাবা মা সুনীলকে ভালো চোখে দেখে তাই তারা তাকে মেনে নিয়েছে ।আর অনিশাকে সুনীলের মা ও পছন্দ করে। কেয়ার বিয়ে হলেই সুনীল ও অনিশার বিয়ের ফুল ফুটবে।  ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করেই অনিশাকে বিয়ে করবে সুনীল এই আশ্বাস দিয়েছে অনিশাকে।    

কেয়ার বউ সাজা এখনো হইনি তা দেখে অনিশা  বলতে লাগলো তুই এখনো কিছুই করিসনি; চল আজ আমি তোকে নিজের হাতে  লাল টুকটুকে বউ সাজিয়ে দিবো। এই বলে কনে কে সাজাতে নিয়ে গেল অনিশা। ফাইয়াজ সহ সুনীলের সব বন্ধুরা আসলো কনার বিয়েতে।  বরযাত্রীরা ও চলে এলো। অনিশা বউকে বিয়ের আসরে নিয়ে এলো। ফাইয়াজ বন্ধুদের সঙ্গে মজা করতে করতে হঠাৎ অনিশার দিকে চোখ পড়লো।  ক্ষানিক ক্ষনের মধ্যে ফাইয়াজের মনে প্রেমের হাওয়া দুল খেতে লাগলো। আর মন হতে লাগলো দুনিয়ায় সবথেকে সুদর্শনী নারীকে হয়তো সে দেখছে।ফিসফিস করে বলতে লাগলো –

বাহ!

মেয়ে যেন মেঘের ন্যায় স্বচ্ছ ও দুধে আলতা গা,  মুখ যেন শ্রাবস্তীর কারুকাজ। এক ঝলকে হৃদয় তোলপাড় করে দিশেহারা করে দিয়েছে। ফাইয়াজ জানতো সুনীলের প্রেমিকা আছে কিন্তু সে যে অনিশা তা জানতো না। বন্ধুরা জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে ফাইয়াজ?  তুই ফিসফিস করে কি বলছিস? ও কিছু না বলে ফাইয়াজ কথা কাটলো। 

বিয়ে সম্পূর্ণ  হওয়ায় বাবা হীন একমাত্র বোনকে    তার বরের হাতে তুলে দিলো সুনীল । তখন থেকেই বুকে চিনচিন ব্যাথা হচ্ছিল সুনিলের।  বিদায়ের সময় অনিশা ,সুনীলের আত্মীয় ও বন্ধুরা সবাই উপস্থিত ছিলো। ফাইয়াজ আর সুনীল একসাথেই হাটছে। বোনকে বিদায় দিয়ে আসার সময় সুনীল বোনের চলে যাওয়ার শোক মেনে নিতে না পেরে  হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাক করে ফাইয়াজের কোলে ঢলে পড়ে। অনিশা দেখে চিৎকার করে উঠলো। অনিশার এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে ;মনের মধ্যে আচমকা কষ্ট এসে ভিড় করছে।   কেন এমন হচ্ছে? সুনীল তো শুধু হার্ট অ্যাটাক করেছে, এইটা তেমন বড় কিছু না ঠিক হয়ে যাবে এই বলে আশ্বাস দিতে লাগলো। তবুও কেন জানি মন মানছে না। 

সুনীলকে হাসপাতালে নিবে বলে পরিবারের সবাই সিদ্ধান্ত নিলো। সুনীলের সাথে হাসপাতালে যাবার জন্য অনিশা ও সুনীলের মা আর বন্ধুদের মধ্যে ফাইয়াজ রওনা হলো।  হাসপাতালে যাবার পথে এম্বুলেন্সে সুনীল মার হাত চেপে ধরে বললো আমার আর খুব বেশি সময় নেই মা। তোমার হবুবৌমা অনিশা কই? শেষ বারের মতো ওর চাদেঁর ন্যায় মুখখানা একটু দেখতে চাই মা।  আমার সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে মা। এ তুই কি বলছিস বাবা। তোর কিছু হবে না বাবা। তুই ঠিক হয়ে যাবি এই বলে সুনীলের মা কান্নাকাটি শুরু করলো। মায়ের পাশে বসে থাকা স্তব্ধ দিশেহারা অনিশা কাছে এসে সুনীলের হাত ধরে কাছে এসে বসলো আর কান্না চেপে সাহস করে   সুনীলকে বলছে তোমার কিছু হতে পারে না । সুনীল অনিশাকে বললো তোমার সাথে আমার আর স্বপ্নের ঘরবাঁধা হলো না। বিধাতা হয়তো এই জন্মে তোমাকে আমার ভাগ্যে রাখে নি । পরের জন্মে যেন আমি তোমাকে পাই এই প্রত্যাশাই রইলো।সুনীল অনিশাকে আরো বললো আমাকে তুমি মাফ করে দিও আর তুমি ভালো থাকো। অনিশা অনবরত চিৎকার করে  কাঁদছে।   

সুনীল কেমন জানি ছটফট করছে আর বন্ধু ফাইয়াজকে খুঁজছে।  ভাগ্যের কি চরম পরিহাস ফাইয়াজ ও সেদিন তাদের সাথ উপস্থিত ছিল। কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে সুনীলের।  ফাইয়াজ নিজেকে সামলিয়ে দুচোখ মুছে সুনীলের কাছে এসে বসলো। পরক্ষণে সুনীল ফাইয়াজকে হাত ধরে বললো ছোট বেলা থেকেই তোকে আমি চিনি আর এটাও জানি তুই আমার কথা কখনো ফেলবি না।  আমার একটা কথা রাখবি তুই। তুই আমার অনি… শাকে দেখে রাখি…স।  

কথ শেষ করতে  না করতেই সুনীল জোড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে  বলছে খুব কষ্ট হ.. মা… এই বলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে না ফেরার দেশে চলে গেল সুনীল ।  সুনীলের মৃত্যুর আৎত্মনাদ যেন সবাকে ছেয়ে গেলো। চঞ্চল, প্রানবন্ত স্বভাবের মেয়ে অনিশা সেই দিনের পর থেকে কেমন জানি চুপসে গেল। নিয়তির চরম খেলায় আজ অনিশা পরিশ্রান্ত  ।

Read More >>  একটি বাংলা রম্য গল্প

Leave a Comment