বাংলা গল্প – আবেগের ভালোবাসা

টিং টং করে হঠাৎ আমার মোবাইলটা বেজে উঠলো। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি ঈশিতার ফোন। হ্যালো ঈশিতা ভালো আছিস? হ্যাঁ ভালো আছি রিনি। তারপর ঈশিতা বলল কাল ভার্সিটিতে কয়টায় আসবি? আমি বললাম কাল কেন? আরে তুই ভুলে গেছিস, কালনা আমাদের নবীন বরণ। ও আচ্ছা আচ্ছা তাই তো। আমি কাল সকাল বেলায় ভার্সিটিতে আসবো। ঠিক আছে ঈশিতা তাহলে এখন ফোন রাখি। ok রিনি। ঈশিতা হলো আমার কলেজ বান্ধবী। সে অনেক সুন্দর, অনেক লম্বা, তবে বেশ চঞ্চল। ইশিতা পড়াশোনা একটু অমনোযোগী। তবে পরীক্ষায় ভালো পাস করে। পরদিন সকালে আমি ভার্সিটিতে গেলাম। দেখি ঈশিতা নীল শাড়ি পড়ে এসেছে। নীল শাড়িতে তাকে যেন নীল পরীর মত লাগছে।

আমি, ঈশিতা ও আমরা নতুন যারা ভর্তি হয়েছি সবাই একসাথে বসলাম। একটু পরেই সিনিয়র আপু ও ভাইয়ারা আমাদেরকে ফুল, চকলেটও কলম দিয়ে বরণ করল। সন্ধ্যা হয়ে গেল আমি ও ঈশিতা ভার্সিটি থেকে বের হয়ে বাসায় চলে আসলাম। দুদিন পর ভার্সিটিতে আসলাম, ক্লাসে ডুকেই আমি 2nd বেঞ্চে বসলাম । পেছন থেকে কে যেন আমাকে রিনি বলে ডাক দিল।মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম ঈশিতা আমার পেছনের বেঞ্চে বসলো। আমার কাধের উপর হাত দিয়ে সে বললো কি খবর দোস্ত? আমি বললাম ভালো ঈশিতা,তুই?হ্যা, আমিও অনেক ভালো আছি।

কিছুক্ষণ পর কয়েকজন সিনিয়র ভাইয়া আমাদের ক্লাস রুমে আসলো তারা আমাদের কে বলল যদি তোমাদের কোন সমস্যা হয় তাহলে আমাদেরকে জানাবে যদি কোন বই কিংবা বুকলিস্ট লাগে তাও আমরা তোমাদেরকে দিব। আমার পিছনে ঈশিতা আস্তে আস্তে বলতে লাগল যে অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম চুপ কর ঈশিতা। ক্লাস শেষ করে বের হওয়ার সময় একটা সুন্দর লম্বা হ্যান্ডসাম সিনিয়র ভাইয়া একটা কাগজ ঈশিতার হাতে ধরিয়ে দিল। এটা দেখে আমি তো অবাক হয়ে গেলাম! ঈশিতা তড়িঘড়ি করে কাগজটা খুলে দেখল, দেখে বলল এইটা কি? বুক লিস্ট!আরে আমি ভাবলাম কি না কি? আমরা দুজনেই ভাইয়াটাকে থ্যাঙ্কস জানালাম। ভাইয়াটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন সিনিয়র ভাইয়া আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলতে লাগল এই বইগুলো পড়েই কিন্তু রিপন ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে।

এতক্ষণে বুঝলাম এই ভাইয়ের নাম রিপন। তারপর রিপন ভাইকে আমরা বললাম ভাই আজকে তাহলে আসি। রিপন ভাই ও বলল ঠিক আছে আসো। রিকশায় বসে আমি বললাম ঈশিতা সিনিয়র ভাইয়েরা অনেক হেল্পফুল তাইনা? ঈশিতা হাতে মোবাইল টিপতে টিপতে অন্যমনষ্ক হয়ে বলল হুম। আমি ঈশিতার হাত ধরে বললাম তুই ব্যস্ত নাকি? ঈশিতা চমকে উঠে আমার দিকে তাকিয়ে বলল আর বলিস না আমার বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে অনেক ঝামেলায় আছি। ভাবতেছি ওকে ক্লোজ করে দিবো। মানে! মানে ব্রেকআপ করে দিব।

কখন যে রিলেশন করেলি সেটা জানতে পারলাম না আর এখন ব্রেকআপ করে দিবি সেটা জানতে পারলাম। সে আমাকে উত্তর দিল কত আশে কত যায় তোকে কোনটার কথা বলবো বল ? আমি ঈশিতা কে বললাম রিয়েল ভালোবাসা একটাই হয় অনেক গুলো না। ঈশিতা আমার কথা শুনে হাসতে লাগল। আমি আমার বাসার সামনে রিকশা থেকে নেমে গেলাম ঈশিতা ওর বাসায় চলে গেল। দুদিন পর আমি ভার্সিটিতে গেলাম । ক্লাস রুমে ঢুকতেই দেখি ঈশিতা পিছনের বেঞ্চে বসে ফোনে কথা বলছে।

আমি যথারীতি সেকেন্ড বেঞ্চে বসলাম। আমি কিন্তু সেকেন্ড বেঞ্চে বসতে খুব পছন্দ করি, তাই সবসময় অন্য বেঞ্চে খালি থাকলেও আমি সেকেন্ডই বেঞ্চে বসি। আমার সামনে এবং পাশের ফ্রেন্ডরা নিজেরা নিজেরা গল্প করছিল ওরা সবাই একই কলেজ থেকে এসেছে। আমার কলেজ থেকে এ ভার্সিটিতে শুধু আমি ও ঈশিতা চান্স পেয়েছি আর আমার বাকি বন্ধুরা অন্য ভার্সিটি গুলোতে চান্স পেয়েছে।। ক্লাস শেষ করেই বের হওয়ার সময় ঈশিতা আমার হাতটা ধরে বলল চল ক্যান্টিনে যাব তোকে সারপ্রাইজ দিবো। ক্যান্টিনে বসার পর ঈশিতা অনেকগুলো খাবারের অর্ডার করলো এবং ফোন হাতে নিয়ে কাকে যেন ফোন দিয়ে বলল তুমি তাড়াতাড়ি ক্যান্টিনে আসো প্লিজ এক্ষুনি।

আমি ঈশিতা কে জিজ্ঞেস করলাম কাকে আসতে বললি? ঈশিতা বলল রিপন ছাগল। আমি বললাম রিপন কে? ও বললো চিনলিনা, আরে আমাদের সিনিয়র সে রিপন। দ্বারা ওয়েট কর, দেখবি, সে এখন আমার নতুন বয়ফ্রেন্ড বুঝলি। বলতে না বলতেই রিপন ভাই হাজির। আমি ওনাকে সালাম দিলাম। উনি বই এবং সাজেশন ভর্তি একটা ব্যাগ ঈশিতার হাতে দিলো এবং বলল এই বইগুলো পড়বা তাহলে অনেক ভাল রেজাল্ট করতে পারবা। আমি অবাক হয়ে গেলাম ওদের রিলেশন দেখে! মাত্র 2 দিনে, কি করে সম্ভব? খাওয়া-দাওয়া শেষে ক্যান্টিন থেকে বের হওয়ার সময় ইশিতার রিপন ভাইকে বলল চলো আজকে আমরা পার্কে যাব, রিপন ভাই বলল আজকে যেতে হবে? হ্যাঁ আজকেই যেতে হবে।

আমি ঈশিতাকে বললাম আমি যেতে পারব না আমার টিউশনি আছে। এই বলে আমি রিক্সায় করে বাসায় চলে আসলাম। রাত্রে ঈশিতাকে ফোন দিলাম ওদের লাভ স্টোরি শোনার জন্য বাট দেখি ওর ফোন ওয়েটিং। কিছুক্ষণ পর আবার ফোন দিই তাও দেখি ওয়েটিং। এর ঘণ্টাখানেক পরে সে আমাকে ফোন দিল এবং আমি জিজ্ঞেস করলাম এতক্ষন কার সাথে কথা বলতেছো? সে বলব রিপনের সাথে। আমি আর ওকে কিছুই জিজ্ঞেস করলাম না কারণ ও খুব সহজেই রিলেশন করতে পারে।

পরদিন ভার্সিটিতে গিয়ে দেখলাম রিপন ভাই ও ঈশিতা এক সাথে হাত ধরে ক্যাম্পাসে হাঁটছিলো, দূর থেকে তাদেরকে খুব সুন্দর লাগতেছে দুজনে লম্বা তে সমান সমান। এভাবে তাদের প্রেম ফার্স্ট ইয়ার, সেকেন্ড ইয়ার, থার্ড ইয়ার এবং ফাইনাল ইয়ার পর্যন্ত চলতে লাগলো। তাদের এই ভালোবাস দেখে মাঝে মাঝে হিংসা হতো কিন্তু তারপরও মন থেকে দোয়া করতাম তাদের এই ভালোবাসা যেন দীর্ঘজীবী হয়, সারাজীবন টিকে থাকে।

এরই মধ্যে রিপন ভাই বিবিএ কমপ্লিট করে এমবিএ-তে ভর্তি হলেন একই ভার্সিটিতে। অনেকদিন পর ভার্সিটিতে আসলাম ফাইনাল ইয়ারের রেজাল্ট নেওয়ার জন্য।ঈশিতাও অসলো।দেখলাম ওর হাতে অনেকগুলো কার্ড। একটা কার্ড আমার হাতে দিয়ে বলল ধর, আমি কার্ডটা খুলে দেখলাম ঈশিতার বিয়ের কার্ড। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম রিপন ভাইয়ের সাথে? ও আমাকে রেগে বললো রিপন কেন হবে আমি যাকে বিয়ে করতেছি সে একটা প্রাইভেট ব্যাংকে জব করে মাসে 40 হাজার টাকা স্যালারি পাই। আমি ওকে বললাম রিপন ভাইয়ের সাথে এতদিনের রিলেশনের কি হবে?

ঈশিতা আমার সাথে রেগেমেগে বলল দেখ রিনি আবেগ দিয়ে জীবন চলে না। রিপন এখনও বেকার, কবে এমবিএ কমপ্লিট করবে, কবে একটা ভালো জব পাবে, কবে স্তব্লিস্ট হবে? ভালো জব নাও তো পাইতে পারে। কে এতদিন অপেক্ষা করবে বল বাদ দে তো সব, আমার বিয়েতে আসিস, এই বললেই ঈশিতা ভার্সিটি থেকে বের হয়ে গেল। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম সারারাত একটুও ঘুমাতে পারেনি। আমার চোখের উপরে ওদের দুজনের ঘুরে বেড়ানো, খাওয়া-দাওয়া সব কিছুই ভাসতে লাগল।

আহা কত সুন্দর জুটি ছিল ওদের। কেন যে মেয়েটা এমন করলো?সতি্ ঈশিতাকে আমি নতুন করে চিনলাম! হায় রিপন ভাইয়ের এখন কি অবস্থা আল্লাহই জানে, উনি ঈশিতাকে অনেক ভালোবাসতেন। আমি ঈশিতার বিয়েতে যাইনি, কারণ আমার খুব খারাপ লেগেছিল ওর ব্যবহারে। আমার অন্য ফ্রেন্ডরা ওর বিয়েতে গিয়েছিল ওদের কাছে শুনলাম ঈশিতার বর নাকি ওর থেকে এক ইঞ্চি খাটো। আমি বিন্দুমাত্র অবাক হলাম না কারন এখন ঈশিতার কাছে টাকাটাই হচ্ছে বড়, মানুষটা না। যাইহোক খুব ভালো থাকুক সুখে থাকুক এটাই ওর জন্য দোয়া করি।

এরপর আর কখনও রিপন ভাইয়ের সাথে আমার দেখা হয়নি। দু’বছর পর আমি যখন বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার জন্য কোচিং করতে ছিলাম হঠাৎ ম্যানেজার এসে বিজ্ঞপ্তি দিলেন আমাদের কোচিং থেকে এবারের বিসিএস পরীক্ষায় একজন প্রথম হয়ে কাস্টমস অফিসার হয়েছেন। কাল তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে সবাই উপস্থিত থেকো। পিছন থেকে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে ম্যানেজার স্যার কে জিজ্ঞেস করলেন স্যার ওনার সেলারি কেমন হতে পারে ম্যানলেজার স্যার বললেন উনার স্যালারিকমপক্ষে 70 থেকে 80 হাজার টাকা হবে, একটা গাড়ি পাবে প্লাস সরকারি কোয়ার্টার পাবে। সবাই বলল বাহ এটাতো রাজার হাল।

পরদিন কোচিঙের অনুষ্ঠানে এসে উপস্থিত হলাম সামনে জায়গা পায়নি বলে পেছনে বসলাম। অনুষ্ঠান শেষে চিপগেস্ট অর্থাৎ কাস্টম অফিসার যখন বক্তৃতা দেওয়া আরম্ভ করল দূর থেকে উনাকে দেখে কেমন যেন চেনা চেনা লাগলো কিন্তু বুঝতেছিনা। যখন অনুষ্ঠান শেষ করে উনি বাইরে বেরিয়ে আসলেন অনেকে ওনার পেছন পেছন এলেন। উনি কিভাবে সাকসেসফুল হলেন, কোন বইগুলো ফলো করলো জিজ্ঞেস করলেন? আবার অনেকেই উনার ফোন নাম্বারটাও নিলেন। আমি সামনের দিকে যেতেই হঠাৎ থমকে গেলাম!কারণ এ আর কেওই না, আমার চির চেনা সেই রিপন ভাই।

স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসা

স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসা নিয়ে কিছু কথা এখানে লিখা হলো। আমাদের সবার উচিৎ এই সম্পর্ক কে ইসলামিক নিয়ম অনুযায়ী ঠিক করে রাখা। কারন এই সম্পর্ক হলো একটি চিরস্থায়ী সম্পর্ক।

স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসা

স্বামী ও স্ত্রীর বন্ধন নাকি সাত জনমের। অর্থাৎ এই জীবনে যে আপনার স্ত্রী বা সহধর্মিণী হবেন বা হয়েছেন তার সাথে এ জনমের পরেও আবার দেখা হবে বা পূর্ব জনমেও দেখা হয়েছে। একজন স্বামীর যেমন তার স্ত্রীর উপর অনেক দায়িত্ব থাকে। তেমনি স্ত্রী এর ও অনেক দায়িত্ব থাকে তার স্বামীর প্রতি।কিন্তু এই সম্পর্কটি শুধুমাত্র দায় বা দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ভালবাসার সম্পর্ক মায়ার সম্পর্ক।আর এটি শুধু মানুষের কথা নয়।ধর্ম ও বিজ্ঞান উভয়ই এর সমর্থন করে।অনেকেই মনে করেন ইসলাম ধর্মে ভালবাসা বলতে কোন বিষয় নেই এবং এটি সম্পুর্ন নিষিদ্ধ। কিন্ত না মহানবী বলেছেন “তোমরা ঐ পর্যন্ত জান্নাতে যেতে পারবেনা যতক্ষণ না পর্যন্ত মুমিন হও, আর ততক্ষন পর্যন্ত মুমিন হতে পারবেনা যতক্ষণ না পর্যন্ত একে অপরকে ভাল না বাসো।” তাহলে ভালোবাসার গুরুত্বপূর্ণতা বুঝতেই পারছেন।তবে এ ভালবাসা হতে হবে বৈধ ও সমাজ স্বীকৃত।আর স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক সামাজিক ও ধর্মীয় উভয় দিক থেকে পবিত্র সম্পর্ক।স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসা

কিন্তু আসল কথা হলো স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসা কেমন হতে পারে বা হওয়া উচিত? স্বামী-স্ত্রীর মাঝের ভালবাসা হওয়া উচিত সত্য এবং কোনরূপ মিথ্যা পূর্ন নয়।কারন সম্পর্কটা কিন্তু একদিন বা দুইদিনের নয় সারাজীবনের।আর মিথ্যা কখনো চাপা থাকে না একদিন তা প্রকাশ পাবেই।আর তখন এই মিথ্যা ভালোবাসার সাময়িক সুখ পরিনত হয়ে যাবে অশান্তির কালো মেঘে।তাই এই সম্পর্কের মাঝে কখনোই মিথ্যা যেন আসতে না পারে সে বিষয় দুজনেরই সমান এবং সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিত।

একে অপরকে বুঝতে হবে।কোন বিষয় সঙ্গীর ভালো লাগে বা কোন বিষয়ে সে কষ্ট পায় সেগুলো জানতে হবে।এবং তার খারাপ লাগে এমন কাজ করে তাকে কখনোই কষ্ট দেওয়া উচিত নয়।বরং তার ভাল লাগাকে গুরুত্ব দিতে শিখুন।দেখবেন দাম্পত্য জীবন হয়ে উঠবে সুখী এবং সমৃদ্ধ!

স্বভাবতই পুরুষরা চাকরি বা অন্য কাজ করে পরিবারের পরিচলন খরচের যোগান দেন।এবং নারীরা থাকে গৃহ পরিচালনার দায়িত্বে।আর এমনটিই চলে আসছে আমাদের সমাজে যুগের পর যুগ।এবং অনেক পুরুষ আছে যারা কাজ শেষে বাসায় ফিরে স্ত্রীর সাথে খারাপ ব্যবহার করেন।যা একদমই ঠিক নয়।কারন আপনি যেমন বাহিরে কাজ করে পরিশ্রান্ত তেমনি আপনার স্ত্রীও কিন্তু সারাদিন বাসার সকল কাজ সামলিয়েছে।কষ্ট তারও হতে পারে এটা বুঝতে শিখুন।এবং সারাদিনের কর্মব্যস্ত জিবনে শেষে বাসায় ফিরে তার সাথে মিষ্টি আচারন করুন।তার খোজ নিন সারাদিন কেমন কাটল ইত্যাদি।দেখবেন সেও ভালবাসা দিয়ে আপনার সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দিবে।কারন মনের প্রশান্তি হলো সবচেয়ে বড় জিনিস।

তাহলে বুঝতেই পারছেন একটি সুখী সুন্দর দাম্পত্য জীবন কাটাতে স্বামী স্ত্রী এর মাঝে ভালোবাসা থাকাটা কত জরুরি।এবং এটি একদিকে যেমন আপনার জীবনকে করে তুলবে সুখী তেমনি একে অপরের প্রতি সম্মানবোধ ও জাগ্রত করে তুলবে।

লাভ স্টোরি রোমান্টিক ভালবাসার গল্প

লাভ স্টোরি রোমান্টিক ভালবাসার গল্প  টি এখানে দেয়া হলো । আশাকরি পড়ে অনেক ভালো লাগবে । যদি ভালো লাগে আমাদের জানাবেন । আমরা আরো নতুন নতুন লাভ স্টোরি আপনাদের কাছে নিয়ে আসবো ।লাভ স্টোরি

লাভ স্টোরি রোমান্টিক ভালবাসার গল্প:

হঠাৎ একদিন রাত এগারটায়
ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠলো,
হ্যালো কে বলছেন ? ওপার থেকে
অসম্ভব মিষ্টি একটা কণ্ঠ ভেসে এলো
যেন স্বর্গের অপ্সরাকথা বলছে । খুব
হক চকিয়ে গেলাম আবার পুলকিতও হলাম ভয়ানক ভাবে ।
বিনা মেঘেবজ্রপাতের মতো এমন অচেনা করো কার না ভাল লাগে ।
খুব স্পষ্ট করেআমাকে
এ চাইলো যেন কত কালের
চেনা জানা । তার পরিচয় জিজ্ঞেস
করলাম,বিস্তারিত কিছু বললো না
আশ্চর্য হবার শুরু সেদিন থেকেই ।

এরপর থেকে প্রত্যেক রাতে ঠিক
এগারটায় কলটা আসতো । মন্ত্রমুগ্ধের
মতো নেশাগ্রস্তের মতো কথা
বলতামভোর রাত পর্যন্ত । হয়তো
একেই বলে প্রেম, মরুময়ব্যাচেলর
জীবনের প্রথম প্রেম । দিন দিন অবস্থা
আরো ভয়াবহ হলো, বিকেল থেকে ওর
কলের জন্য অপেক্ষা করতাম । ওর
কল না আসা পর্যন্ত হাশপাশ করতে
থাকতাম,এভাবে চলল পুরো এক মাস।
মানুষ তো চেহারা দেখে প্রেমে পড়ে,
আর আমি পরলাম…

কখনো ওর ফোন নাম্বার জানতে। >>চাইনি,ঠিকানা তো অনেক পরের
ব্যাপার । দিন যেন যাচ্ছে ঝড়ের
গতিতে, একিচরম এক মনোমুগ্ধতা
ঘোরের মধ্যে কাটছে দিন রাত, সারাদিন শুধু ওর ই চিন্তা । কতদিন যে ওর সাথে দেখা করতে চেয়েছি, ও এড়িয়ে গেছে, বলেছে পরে, সময় হলে । আমি ও অপেক্ষা করছি,শুধু এক সুন্দর ভবিষ্যতের আশা । আর মনে মনে বুনে চলেছি স্বপ্নের এক কারুকাজ । এভাবে স্বপ্নের ঘোরে আরোতিন মাস পেরিয়ে গেলো চোখের পলকে । কল্পনা করতাম কত শত কিছু, হয়তো ও ওর কণ্ঠের মতোই সুন্দর । দিনটা স্পষ্ট ভাবে মনে আছে, ১৩ এ আগস্ট । সেদিন রাতে কোন ফোন কল এলো না । সারা রাত ছটফট করলাম ঘুম এলো না । এভাবে ছটফট করতে করতে সকালে কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম মনে ই নেই । নাওয়া খাওয়াভুলে গেছি চোখ সারাদিন পরে থাকে ফোনের দিকে । সেদিন ও কোন ফোন এলো না । পাগলের মতো হয়ে গেলাম যেনো । আজ ৮ দিন হয়ে গেছে একবারো ও ফোন করেনি । আমার মাথা ঠিক মতো কাজ করছে না । চোখের নীচে কালি পড়ে গেছে, মাথার চুল উস্‌কো খুসকো হয়ে গেছে । গোসল নাওয়া খাওয়া নাই কিছুই মনে নাই, কখন যে কি করি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম । অনেক চেষ্টা করলাম,ওর কোন হদিস ই বের করতে পারলাম না । আজ ১৩ দিন হয়ে গেছে একবারো ও ফোন করেনি । আমি শয্যাগত, স্যালাইন দেয়া হয়েছে, সারাদিন শুধু বিড়বিড় করি আর ওর নাম বলি । দুই জগতের সন্ধিক্ষণে এখন আমি । কিন্তু ফোন আর এলো না!

Valobasar golpo

In this post you will get valobasar golpo or bangla love story. We have posted here some valobasar golpo. These golpo that means love story are very nice and new. So you will enjoy reading these valobasar golpo.

Valobasar golpo ( ভালোবাসার গল্প ) ঃ

এখানে আমার নাম ব্যবহার করা হয়নি এবং আমার ছাত্রছাত্রী সবার নাম প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রুপা, রবি, রনি ।

তখন আমি আনেক ছোট । বয়স সাত কিংবা আট। অন্য সবার থেকে একটু আলাদা টাইফের ছেলে ছিলাম আমি। সাহসী না ভিতু ছিলাম । তাই যদিও সবার সাথে মিলে মিশে থাকতাম তথাপি মারামারি লাগলে সবার আগে ছুটে পালাতাম। নিন্ম পরিবারের ছেলে তাই মনে ভয় কাজ করত । বাবা মজুরি দিয়ে সংসার চালাতেন। খেলা ধূলা ভাল পারতাম । তাই পড়ালেখা থেকে খেলাধুলার প্রতি বেশি মনোযোগ ছিল। এলাকার সবার সাথে যখন থাকতাম তো সবাই হৈ চৈ করে বেড়াতাম। ( Valobasar golpo ভালোবাসার গল্প )

এলাকার মানুষের নিজের নাম ছাড়াও দুষ্টু লোকদের দেওয়া নাম আছে। তো আমি একদিন সবার সাথে রাস্তার পাশে বসে আছি। আমাদের বাড়ির পাশে আবার বড় রাস্তা আছে। রাস্তার পাশে চাষের জমি। খোলা মাঠ হওয়ার কারণে রাস্তার পাশে বসলে ঠাণ্ডা বাতাস লাগত। এখনো আমরা সেখানে বসি।

এমন একটি চঞ্চল মেয়ে ছিল আমাদের পাশের বাড়ির। যাকে সবাই গুন বলে ডাকত। আসলেও সে ছিল একটু বেশি চঞ্চল। সে মেয়েটি তার বাড়ির এক জেঠুর সাথে দোকান থেকে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। আমাদের মাঝে একজন গুন বলে উঠল। মেয়েটি অনেক বকাবকি করল। সেই প্রথম আমি মেয়েটিকে দেখি। পরে সবার কাছে জানতে পারি তার নাম রুপা । তখন থেকেই কিন্তু মেয়েটির প্রতি আমি একটু দুর্বল ছিলাম।

এর মধ্যে আমি ষষ্ঠ শ্রেনীতে ভর্তি হলাম । পরিবারের অভাবের কারণে তিন মাস পরে আমি ঢাকায় চলে যাই। এক বছর থাকার পর বাড়িতে আসি। আমি ঢাকা থাকার সময় প্রতি রাতে স্বপ্ন দেখতাম আমি পড়াশুনা করি। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আমাকে খুব আদর করে। ঘুম থেকে উঠে চোখের পানি মুচতাম। বাড়িতে আসার পর আমার ইচ্ছা হয় আবার পড়ার জন্য। ( Valobasar golpo ভালোবাসার গল্প )

আমি ঘরে আমার পড়ার কথা বলি । সবাই খুশি হয় এবং আমাকে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি করিয়ে দেয়।

আমি প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় তিন বিষয় ফেল করি। আমার পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ দেখে সবাই আমাকে উৎসাহ দিতে থাকে। আমিও আরো বেশি করে চেষ্টা করতে থাকি। অষ্টম শ্রেণীতে আমার রোল ১ । বাড়ির পাশের এক চাচা তার ছেলেকে প্রাইভেট পড়ানোর জন্য বলে। আমিও রাজি হয়ে যাই। তিনি বিদেশ থাকেন। একটি মাত্র ছেলে নাম রনি । তাই কিন্ডার গার্ডেনে প্লে শ্রেণীতে ভর্তি করেন। তখন থেকে আমার প্রাইভেট জীবন শুরু।

এক বছর পড়ানোর পর সে পরীক্ষায় মোটিমুটি ভালো করে। রনি নানার বাড়ি আবার রুপা বাড়ি । রনির আম্মু আবার আমাকে নিজের ছেলের মত জানে। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। রনির সাথে আবার রুপার ছোট ভাই পড়ত। কথায় কথায় রুপার আম্মু রনির আম্মুকে জিজ্ঞেস করল রনি কার কাছে প্রাইভেট পড়ে। তখন তিনি আমার কথা বললেন। রুপার আম্মু রনির আম্মুকে বললেন আমি যেন তার সাথে দেখা করি।

আমি যখন শুনলাম তখন আমি খুব আনন্দিত হলাম। একদিন তাদের বাড়িতে গেলাম। যাকে পড়াবো তার নাম পিয়াস। পিয়াস খুব দুষ্ট ছেলে। কথা হলো নাজিমের সাথে পড়বে। দুজনকে পড়াচ্ছি প্রায় এক বছর । আমি এ বছর ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে রনি ও রবি এর বার্ষিক পরীক্ষা শুরু। রবি বাড়িতে পড়েনা তাই তাকে পরীক্ষার সময় তাদের বাড়িতে গিয়ে পড়াতে হবে। এর ভিতর আমি আরো তিনটা প্রাইভেট পড়াই। মোটামুটি আমার ভালো সুনাম ছড়িয়ে পড়ল এলাকায়। রবি কে যখন পড়াতে গেলাম দু দিনের দিন রুপা আমার সামনে নাস্তা নিয়ে আসল। ( Valobasar golpo ভালোবাসার গল্প )

আন্টি আমার পাশে খাটে বসে আছেন। বললেন এই আমার বড় মেয়ে। অষ্টম শ্রেনীতে পড়ে। তখন আমি রুপাকে অনেক গুলো প্রশ্ন করলাম । সে উত্তর দিতে পারেনি। আমি তাকে ইংরেজির উপর প্রশ্ন করেছিলাম। তখন তাকে বললাম তোমার থেকে বড় ছাত্র-ছত্রী পড়াচ্ছি। আমি আবার আমার এক ক্লাসমেটস কে হিসাব বিজ্ঞান ও ইংরেজি পড়াতাম। তাই আমার সাহস ও ভালো ছিল। এছাড়াও আমি দশম শ্রেনীতে থাকা অবস্থায় সকাল ছয়টায় এক বাড়িতে দ্বিতীয় শ্রেণীর একটা ছাত্রকে প্রাইভেট পড়াতাম , তখন আমার এক শিক্ষকও সেখানে একই সময়ে প্রাইভেট পড়াতো। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। এসব কারনেই পড়ালেখার ব্যাপারে অনেক সাহস ছিল। ( Valobasar golpo ভালোবাসার গল্প )

কথায় কথায় রুপা ও রবিকে তাদের বাড়িতে পড়ানোর জন্য প্রস্তাব আসলো। প্রথম প্রথম রুপা একটু কম পারতো। পরে বুঝতে পারলাম সে ভালোভাবে বাংলাও পড়তে পারেনা । আমি তাকে বাংলা জাতীয় সব বিষয় পড়ানো শুরু করলাম। এভাবে পড়াতে পড়াতে তার আর আমার মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়। পড়ালেখায় ও তারা অনেক ভালো করা শুরু করল। এর মধ্যে আমি এস এস সি পরীক্ষা দিলাম।

এখন আমি যেদিন সময় মত পড়াতে না যাই তবে সে পাগলের মত হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের মাঝে কোনো প্রেমের সম্পর্ক নয় আন্তরিকতার সম্পর্ক। সে যখন দশম শ্রেণীতে উঠল, যত সমস্যা তখন থেকে শুরু হলো । তার শ্রেণীর ক্লাসমেটস ও শিক্ষকরা পর্যন্ত তার পেছনে লাগল। সবাই তাকে কান পোঁড়া দিতে লাগল যে তোকে এতো ভালোভাবে প্রাইভেট পড়ায় তার কোন বাজে মতলব আছে। তার বাড়ির ছেলে-মেয়ে, বাড়ির বড় ভাইয়ের বউয়েরা তাকে খুব হেনস্থা করত আমার ব্যাপার নিয়ে। এসব নিয়ে সে সবার সাথে খুব ঝগড়া করত।

আমি তাকে প্রাইভেট পড়ানোর শুরু থেকে ভুলে গিয়েছিলাম আমি তাকে কখনো দেখেছি। প্রায় দু বছর আমি তাদেরকে পড়াই। রুপা যখন টেস্ট পরীক্ষা দিল , তারপর সে একদিন আমার হাত ধরে জিজ্ঞেস করল আমি তাকে ভালোবাসি কিনা? আমি তো আবাক! আমি তখন তাকে সত্যি কথা বললাম।আরও প্রায় আট বছর আগে আমি যে দিন তাকে প্রথম দেখি সেদিন থেকে তাকে খুব ভালো লাগতো। তবে এখন সেসব নিয়ে ভাবিনা কারন আমার কাছে আমার ক্যারিয়ার বড়। সে এসব শুনে সেদিন আর কিছু বলল না ।

পরের দিন প্রাইভেটে যাওয়ার পর সে আমাকে বলল আমি আপনাকে ভালোবাসি এখন আমি আপনার উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম। আমার তিন দিন খাওয়া ঘুম নেই। তিন দিন আমি প্রাইভেটে যাইনি। এ তিনদিন সে কেঁদে কেঁদে কাটাল। পরে আমি প্রাইভেটে গেলাম। সে দিন প্রথম সে পুরোটা সময় আমার হাত ধরে পড়া শুরু করল। শেষ পর্যন্ত আমি আর তাকে ফেরাতে পারলাম না। শুরু হল আমাদের নতুন একটা সম্পর্ক। শুরু হল আমার জীবনে একটা নতুন অধ্যায়। বইতে থাকল আমার জীবনের বসন্ত। মনের অজান্তেও গান গাইতাম।

তার মাঝেও নতুন ছন্দ। তার চঞ্চলতা নেই , সে খুব আনন্দে দিন কাটায়। খুব আনন্দে যেতে লাগল দিন গুলি। সে কোথাও গেলে আমার জন্য একটা উপহার নিয়ে আসত। একবার সে আমাকে একটা তাজ মহল গিফট দিয়েছে। আমার কাছে একটা এক পয়সা ছিল। যা আমার কাছে এখনও আছে। আমি তাকে এক পয়সা উপহার দিলাম। সে আঙ্ক যত্নে সেটি নিজের কাছে রাখল।

এর মধ্যে আমাদের কথা বার্তা , আচার আচরণ তার বাড়ির এক চাচার নজরে আসে। এমনিতেও তাদের সাথে ঐ চাচার সাথে ছিল দা কুমড়া সম্পর্ক। কবে থেকে সে এবং তার আমাদের পাহারা দেওয়া শুরু করেছে আমরা কেউ তা টের পাইনি। আমি তখন রুপাকে রাত আটটার পর পড়াতাম । একদিন রুপা আমার পেছনে এসে দাড়াল এবং আমার মাথার ছুল আঁচড়িয়ে দিচ্ছে। এর মাঝে সে আমাকে একবার আদর করে একটা চুমু দিয়েছে । কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সামনের জানালার শব্দ হল। সে তো একেবারে অসহায় হয়ে গেল। আমি কি বলব কিছু বুঝতে পারছি না। দু জনে একসাথে বাহিরে চারিদিকে খুজলাম কিন্তু কাউকে দেখতে পেলামনা। এরপর আমি বাড়ি চলে আসলাম।

পরের দিন তো আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম, যখন বাহিরে গিয়ে শুনি, সে এবং তার বউ মিলে কি সব বাজে কথা আমাদের দুজনের নামে রটালো। রুপা এবং তার আম্মু দুজনে কান্না কাটি করে দিন কাটিয়েছে। যথা সময়ে আমি প্রাইভেটে গেলাম। পড়ার শেষে রুপার আম্মু আমাকে বলল বাবা তুমি কাল থেকে বিকেল বেলা পড়াতে আসবা। আমিও বিকেলে পড়ানো শুরু করলাম।

তারপর থেকে রুপা আমাকে এড়িয়ে চলা শুরু করল। সে আমাকে উল্টাপাল্টা সব প্রশ্ন করা শুরু করল। যেমন আমি কি আপনাকে কথা দিয়েছি?, আমাকে আপনি ভুলে যান, আপনি গরিব , আপনার টাকা পয়সা নাই, আমি কোন গরিব ছেলেকে বিয়ে করতে পারব না, তার কাছে আমার এখন আর কোনো মূল্য নেই। এবং সে আমাকে ধমকও দিল যে আমার বাবার টাকা আছে আপনি যদি আমাকে ভুলে না যান তা হলে টাকা দিয়ে আপনার বিরুদ্ধে বিচার বসানো হবে।

আসলেও তাই আমি তো প্রাইভেট পড়ানো টাকা দিয়ে নিজে পড়ালেখা করি ও পরিবারের চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করি। এর মাঝে আমি এইচ এস সি পরীক্ষা দিলাম। আমি কোন কূল কিনারা না পেয়ে তাকে প্রাইভেট পড়ানো বাদ দিলাম। কিন্তু রবি রনির সাথে এসে পড়ে। এখন আমি প্রতি রাতে রুপার দেওয়া উপহার গুলো নিয়ে দেখি এবং চোখের জল ফেলি। একদিন আমি আমার এক পয়সার কথা চিন্তা করলাম। অনেক ভাবনা চিন্তার পর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমার এক পয়সা আমার কাছে রাখব। রবি তখনো আমার কথা শুনত।

একদিন আমি রবিকে বললাম তোকে একটা কাজ দেব, যদি করতে পারিস তবে তোর পুরষ্কার আছে। সে রাজি হল। এবং অনেক কষ্ট করে সে আমার এক পয়সা আমার কাছে এনে দিল। তখন আমি যেন আমার ভালোবাসার প্রিয় মানুষটিকে কাছে পেলাম। তাকে পুরষ্কার দিলাম। এক বছর পর শুনলাম তার বিয়ে হয়েছে , সে প্রেম করে বিয়ে করেছে । আমি আজও একা । আমার এক পয়সা নিয়ে আমি এখন পুরনো স্মৃতি মনে করি। আমি এখন বুঝতে পেরেছি আমি কত বোকা ছিলাম। যদি বোকা না হতাম তবে আমার ভালবাসা বৃথা যেত না।

ভালোবাসার গল্প

বিশাল একটা স্টেশন, এখানে অজস্র মানুষের যাতায়াত প্রতিদিন । ট্রেনের হুইসেল বাজছে, মালপত্র মাথায় নিতে জনে জনে গিয়ে চিৎকার করে অনুরোধ করছে কুলিরা । প্রিয়জনদের পেয়ে কেউ চিৎকার করে ডাকছে, কারো চোখে অশ্রু কাছের মানুষদের মিলনে অথবা বিরহে ।

মাহফুজ চুপচাপ বসে আছে ওয়েটিং রুমের কোনার একটি চেয়ারে । এইখানে এত শত শত মানুষ, তাদের কেউই তার আপন নয়, কাউকেই সে চেনে না । এখন গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলেও এক গ্লাস পানি কেউ দেবে না – এ কথা ভাবতেই কেমন অস্থির হয়ে উঠলো তার মনটা । তার প্রিয়জনদের কথা ভাবতেই এমন লাগছে। অনেকদিন ধরে আজকে দিনটার জন্য অপেক্ষায় ছিল মাহফুজ ।

রুমের পড়ার টেবিলের উপরে রাখা ডেস্ক ক্যালেন্ডার দিতে দিন কেটে দিতে সে একটা লাল সাইন পেন কিনেছিল । লাল রং দিয়ে দাগ দিলে তাতে রাগ বেশি ঝাড়া যায় । কয়েক সপ্তাহ ধরে সে যত্ন করে কেটেছে এক একটা দিন । আজ সকালে স্ত্রী করা সার্ট টা বের করে পড়েছে । পারফিউম গায়ে দিয়েছে । দিনের পরিশ্রমে যেন তার ছিমছাম পরিপাটি ভাবখানা ছুটে না যায় সেজন্য তার চেষ্টার কমতি নেই ।

অফিস থেকে বসকে বলে আগেই বেরিয়ে এসেছে, অনেক দিনের এই অপেক্ষার কথা অফিসের কলিগরা আগেই জানত । তারা সবাই মুচকি হেসে বিদায় দিল দুপুরে লাঞ্চের পরেই। ওয়েটিং রুমে বসে থেকে মাহফুজের কান সজাগ, নতুন কোনো ঘোষণা কিনা, হুইসেল শোনা যায় কিনা নতুন ট্রেন আগমনের । কোন ট্রেন এলেই খোঁজ করছে এটা “অরণ্য নীলিম” কিনা। তাদের অপেক্ষায় এখানে এসেছে সে। তাদের কারো সাথে আবার ফোন নেই। তাই যোগাযোগ করতে পারছে না কেবল অপেক্ষার প্রহর গুনে চলেছে । এ বুঝি এলো কিন্তু অমন অনেকগুলো ট্রেন এলেও তারটার দেখা নেই ।

পাশের চেয়ারে পড়ে থাকা জীর্ণ পুরনো পত্রিকা টা হাতে নিয়ে পড়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালায় সে । নাহ, মন বুঝে না কিছুতেই উসখুস করছে মাহফুজ। অনেকদিন পর আসবে সে তাই ঘরদোর নিজের হাতে পরিস্কার করেছে সে কদিন ধরে। নতুন জানালা দরজার পর্দা লাগিয়েছে । বিছানার চাদর কিনেছে সাদার ভেতর উজ্জ্বল নীল রঙা ফুলে ছাপানো । এই রকমটা তাসনিয়ার অনেক পছন্দ ।

হাতের ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখল সন্ধ্যা প্রায় দিন প্রায় পুরোটাই চলে গেল । স্টেশন মাস্টারের রুমে উকি ঝুকি দিলো সে- চেয়ারটা ফাঁকা রেখে বিরতিতে ভ্রু কুঁচকে এল । এসবের কোন মানে হয় ? একটা কোন এনাউন্সমেন্ট পর্যন্ত নেই । প্লাটফর্মে ইতস্তত পায়চারি করতে থাকে সে । স্টেশন মাস্টারের রুমের বাইরের আয়নায় নিজেকে আরেকবার দেখে নিল সে । যেন পরিপাটি লাগে তাই গেল সপ্তাহে শুক্রবার দিন চুল কাটিয়েছে।

তাছাড়া একা থাকার সময় টায় সপ্তাহের ছুটির দিনেই অনেক কাজ পড়ে যায় তার । একা একা কাপড় দোয়া, রান্নাঘরের সিল্কের জমানো গাধা গাধা বাসন-কোসন ধোয়া , এমনি আরো কত কি । আরেকজন তার এসব কস্টটুকুর জন্য কতই না মন খারাপ করে ভেবে ভালোবাসার মুখটা রক্তিম হয়ে এলো মাহফুজের। হঠাৎ মুখে স্মিত হাসি ফুটে ওঠে তার। পকেটে হাত দিয়ে কাগজ ছুলো সে একটা। তালিকা লিখেছে কাজ ভাগাভাগির ।

এটা নিয়ে দুজনের ডিসুম ডিসুম পাইট হবে সে জানে । তাইতো যত্ন করে লিখে রেখেছে । এতদিন পর দেখা হবে একটু খুনসুটি নাহলে হয় ? লাজুক হাসিতে নিচের ঠোটটা কামড়ে ধরে মাহফুজ । মাগরিবের ওয়াক্ত প্রায় হয়ে এলো । গোধূলির আলোতে প্লাটফর্মে একটা ধোঁয়াটে পরিবেশ তৈরি হয়েছে । এখনো আলো জালানো হয়নি সবগুলো । হঠাৎ দূরে ট্রেনের হুইসেলের শব্দে সম্বিত ফিরে পায় মাহফুজ । বুকের স্পন্দন টের পাচ্ছে সে দুকদুক দুকদুক । আনন্দ উত্তেজনা আর ভালোবাসার স্পন্দন বুঝি এমনি হয় ।

এত অপেক্ষার পর যদি প্রীয়জন টি নেমে আসে সিঁড়ি বেয়ে, সুস্থ শরীর আর মনের পরিচয় প্রকাশক একটা হাসি দেয় – সেই আনন্দ, সেই উদ্বেলিত হৃদয়ের অনুভূতি কি কখনো ভাষায় প্রকাশ করা যায় ? যারা এমন অপেক্ষা করেনি কোনদিন, তারা কিভাবে বুঝবে অপেক্ষার পরে প্রিয়জনদের কাছে পাওয়ার ভালোবাসা কত তীব্র থাকে , তাতে কত গভীরতা থাকে সেই হৃদয়ের কত আকুতি থাকে ।

অনেক দূরে দাঁড়িয়ে ‘চ’ বগীর দরজায় চোখ লাগিয়ে রাখে মাহফুজ । সাদা নীল স্কার্ফ পড়া চিরচেনা মানবীর অবয়ব দেখে যেন আবেগ উথলে উঠে মাহফুজের । তার অপেক্ষার পালা বোধ হয় শেষ হলো । একমাস হলো তাসনিয়া গিয়েছিল বাবা বাড়ি । তার কাছে যেন মনে হচ্ছিল একযুগ দেখেনি সে মেয়েটির গভীর মমতা মাখা চোখ দুটো দুষ্টুমি ভরা হাসি । শোনা হয়নি অফিস থেকে ফিরে বাসার বাসার দরজা খুলেই ভালোবাসা মাখা কণ্ঠের জিজ্ঞাসা “আসসালামুয়ালাইকুম” আজ শরীর মন ভালো তো স্যার ?

Love story bengali

Are you searching for love story Bengali ? you are on the right place where are you will get many romantic and place love story Bengali. we have posted so many love story in Bengali in our other article. So here we are writing one more love story in Bengali for you. if you like our love story in Bengali then you can share this story on your Facebook or Twitter or WhatsApp. We always try to give you the fresh story. So we hope you will enjoy after reading this love story bengali. So let’s see what are waiting for you.

Love story bengali new:

ছেলেটি পছন্দ করে মেয়েটিকে । মেয়েটিও । প্রতিদিনই ক্লাসের চোখাচোখি হয় দুজনের । একে অপরের চোখের ভাষা পড়তে পারে দুজনে । তবুও কিছুটা ভয় অনেকখানি সংকোচ বোধ আরষ্ট করে রাখে সর্বদাই দু’জনকেই । একে অন্যের প্রতি গভীরতম মমতাবোধ গুলো গোপন থাকে মনে তে । কোনদিন কেউ ক্লাসে না এলে অন্যজনের দিন টাই নিরামিষ মনে হয় । আর এ জন্য ক্লাসে না আসার বাঁধাটিকে বকা দিতে থাকে ইচ্ছামত।

এভাবেই দিনগুলো কেটে যেতে থাকে ধূসর । জোসনা রাতের চাঁদটি ও ধীরে ধীরে আপন হতে থাকে দুজনের কাছেই । রোদ মাখা উজ্জ্বল বিকেল টিও কাটতে থাকে মেঘমাখা । ঝুম বৃষ্টির দুপুরগুলোতে নিজেদেরকে একলা আবিষ্কার করতে থাকে তারা । নির্ঘুম রাতের দীর্ঘ সময় টিতে ভাবনার বিষয় গুলো সীমাবদ্ধ হতে থাকে একে অন্যের মাঝে ক্রমান্বয়ে ।

সার্টিফিকেট অর্জনের গণ্ডি পেরোনোর শেষ দিন টিতেও চোখাচোখি হয় দুজনের । কিছুটা কাছাকাছি আসে ও তারা । সৌজন্যবোধ আলাপও মাঝে হয় কিছুক্ষণ । তারপর কিছুটা ভয়ও অনেকখানি সংকোচ বোধ টুকুকে আঁকড়ে ধরে একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নেয় তারা । হতাশ হয় প্রকৃতি । হতাশ হয় মেঘ মুক্ত রোদমাখা আকাশ ।

মেয়েটি চুলের খোপা থেকে বেলি ফুলের মালা টি খুলে ছুড়ে ফেলে দেয় রাস্তায় কিছুটা বিরক্তি । কষ্ট করে শাড়ি পড়া টা নিজের কাছেই নিজেকে বেমানান লাগতে থাকে মেয়েটির । আর ছেলেটি ডানপাশের প্যান্টের পকেটে রাখা কিছু অগোছালো বাক্য দ্বারা তৈরি প্রেম পত্রটি পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে পরক্ষণেই কি যেন ভেবে তা রেখে দেয় যথাস্থানে, সযত্নে ।

অতঃপর কোন এক বৃষ্টির দিনে মেয়েটিকে ছাতা মাথায় পিচঢালা রাস্তায় একাকি হাঁটতে দেখে ছেলেটি । সকল ভয় ও জড়তা কে বিসর্জন দিয়ে ছুটে যায় সে মেয়েটির কাছে । কাকভেজা হয়ে হাঁটু গেড়ে বসে সিনেমা স্টাইলে অদৃশ্য কদম ফুল বাড়িয়ে বলে আমার মহাকালের যাত্রী হবে ? মেয়েটি মুচকি হাসে । পবিত্র হাসিটাকে ভেজাতে পারে না বৃষ্টির ফোঁটা রা, হতাশ হয় তারা ।

Get auto insurance quotes

Get auto insurance quotes. Gaining protection inclusion may not be as simple as you expect, particularly if this is your first time. Youthful drivers, who were recently incorporated into their folks’ strategies, need their very own accident coverage inclusion at some point or another. There are some essential necessities, for example, Mastercard and sparing records; numerous back up plans likewise expect candidates to really have a home. Notwithstanding when the fundamental prerequisites are now satisfied, youthful drivers regularly need to pay very high premium because of different reasons, for instance no home proprietorship or basically absence of driving knowledge. Coordinate General Auto Insurance (or essentially alluded to as Direct Auto Insurance) has its own strategy to make the whole procedures simple. To get Direct Auto Insurance quote, candidates don’t have to really have Mastercard or sparing records, which means youthful drivers can apply with great possibility of endorsement.

Driving background is a likewise an imperative factor to decide protection rate. Without enough experience, insurance agencies will regard youthful drivers as “high-hazard”, which means they should buy non-standard inclusion which is in every case more costly than its ordinary partner. Get auto insurance quotes. When procuring Direct Auto Insurance quote, if you don’t mind recollect that you can utilize the rebate as long as you are qualified for it. For youthful drivers (particularly those without occupation or home possession yet), the “great understudy” markdown is an amazing choice to decrease premium by up to 10%.

You can request Direct Auto Insurance quote on the web or at the organization’s branch workplaces spread crosswise over 13 states. There are in excess of 400 branch workplaces, and you can even gain quote by telephone. Indeed, even without Visa or financial records, you can pay the excellent bill effectively, as well. Actually, auto guide protection enables you to pick an explicit date in multi month to pay the bill, plan your very own timetable, portion designs, and even installment strategies in including on the web, disconnected, and even by means of telephone as well. Get auto insurance quotes.

Youthful drivers can procure the statement on the web and have it conveyed to places of residence. In the event that you don’t know about what kind of inclusion to buy, Direct Car Insurance gives you Virtual Insurance Agents including Coverage Assistant and Life Coach; both are intended to assist you with understanding what inclusion to buy and settle on beyond any doubt that your decisions agree to state’s control. Get auto insurance quotes. Those virtual specialists will ask some basic “YES or NO” questions and give recommendations dependent on your answers. Suggestions are given immediately and naturally when you are requesting cites. Be that as it may, it is conceivable to change the organization’s suggested inclusion plan and basically buy those that you require the most.

ভালোবাসার গল্প ( পরাজয় )

খুব বিরক্ত হয়ে সোফার এক কোনায় বসে আছে ইফতি। শত বিরক্ত হলেও মুখে একটা হাসি ঝুলিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে। ছোট ভাইয়ের বন্ধুর জন্মদিন। মায়ের আদেশে ভাইকে নিয়ে আসতে হয়েছে। নিজের বয়সী কাউকে না পেয়ে বেকার বসে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই। কেক কাটা শেষ, রাতের খাবারটা সেরেই অনুষ্ঠানের সমাপ্তি। ভেতরে সব বাচ্চারা হইচই করছে, একটু বাইরে বের হবে ইফতি। গেটের মুখে এসে থমকে গেলো। মানুষ এতো সুন্দর হয়?! কত বয়স হবে, ইফতি থেকে বড়জোর ২/৩ বছর ছোট। মেয়েটাকে দেখে ইফতির প্রথম মনে হল এই মেয়ের সামনে গিয়ে কথা বলা সহজ হবে না। এতোখানি দৃঢ় ব্যক্তিত্ব আগে কখনও কোন মেয়ের মধ্যে দেখেনি সে। যদিও মেয়েদের সামনে সে বরাবরই কখনও মুখ ফোটাতে পারেনি, তবুও মেয়েটির অদ্ভুত রূপ এবং ব্যক্তিত্ব আচ্ছন্ন করে রাখে অনেকক্ষণ। ছোট ভাইয়ের সাথে অনেকটাই ফ্রী ইফতি। বাড়ি ফেরার পথে আর না থাকতে পেরে ভাইকে জিজ্ঞাসা করে বসে-
-‘হ্যাঁরে প্রতীক, ঐ মেয়েটা কে রে?’
-‘কোন মেয়েটা?’
-“ঐ যে সাদা-কালো জামা পরা লম্বা করে?”
-“ও…উনি? উনি তো আমাদের দীপাদি…দীপান্নিতা… আমরা দীপাদি বলে ডাকি। আমার বন্ধুর বড় বোন। আমাদের স্কুলেই পড়ে। খুব ভালো ছাত্রী।
আচ্ছা! এই ব্যাপার। ইফতির মনে কেবল দীপার আশ্চর্য সুন্দর মুখটা ভাসতে থাকে। ছোটবেলা থেকেই ইফতি একটু মুখচোরা। পরিচিত গণ্ডিতে হৈ-চই করতে তার জুড়ি নেই, কিন্তু অপরিচিত মানুষের সামনে একবারে চট করে সহজ হতে পারে না সে। মেয়েদের বেলায় তো আরও শোচনীয়। যাহোক, কদিন পর ভাইয়ের সাথে কথায় কথায় জানা গেলো দীপাদের বাসাটাও খুব দূরে নয়। কীভাবে যোগাযোগ করা যায় দীপার সাথে ? তখনও এখনকার মতো সবার হাতে হাতে মোবাইল আসে নি। দীপাদের বাসার আসে-পাশে যাতায়াত বাড়তে লাগল ইফতির। দীপার বাবা সরকারি চাকুরে। সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের একমাত্র কন্যা দীপা। কৌশলে একদিন ওদের বাসার দারওয়ানের কাছ থেকে দীপার বাবার মোবাইল নাম্বার টা যোগাড় করে ফেলল সে। কিন্তু ফোন করে কাকে চাইবে সে ? দীপার বাবাই তো ধরবেন। ভাবতে ভাবতে সে রাতে সাহস করে একটা মেসেজ পাঠিয়ে দিলো ইফতি। নাহ, কোন উত্তর নেই।
২/৩ দিন পর যখন ইফতি প্রায় আশা ছেড়েই দিয়েছে, একরাতে হঠাৎ অবাক করে দিয়ে মেসেজ এর উত্তর এলো।
-কে আপনি?
খুশির একটা স্রোত বয়ে গেলো ইফতির ভেতর দিয়ে। নিজের পরিচয় দিতে গিয়েও কি মনে করে প্রতুত্তর করলো সে
-আমি সায়ন । নটরডেম কলেজে পড়ি।
কোন ফোন দেয়া নয়, কেবল মেসেজ আদান প্রদান চলতে লাগল তাদের। জানা গেলো দীপার নিজের মোবাইল নেই। যখন ইচ্ছে হতো তখন বাবার মোবাইল থেকে মেসেজ দিত দীপা। ইফতির উত্তর দিতে দেরি হতো না। আস্তে আস্তে ইফতি বুঝতে পারে, আসলে দীপার কাছের বন্ধু বলতে তেমন কেউ নেই। ইফতির কাছে নিজের সবকিছু শেয়ার করতে ভালবাসে দীপা। ইফতিও যতটা পারে ততটা সাপোর্ট করতে লাগল। কেউ কাউকে না দেখে, কথা না বলে অদ্ভুত এই যোগাযোগ চলতে লাগল। অবশেষে এক রাতে দীপা নিজেই ফোন করলো ইফতিকে। কথায় কথায় নিজের আসল পরিচয় দিলো ইফতি। ভেবেছিল দীপা অনেক রাগ করবে। কিন্তু না, দীপা একটু মন খারাপ করলেও মেনে নিয়েছিল। ৩ মাস পর একদিন দীপার সাথে দেখা হওয়ার সুযোগ হল ইফতির। স্কুলের সামনে গিয়ে দীপার দেখা পেল ইফতি। ইফতির হাতে চট করে একটা হলমার্কের কার্ড ধরিয়ে দিয়েই তরিঘড়ি করে রিকশায় করে মিলিয়ে গেলো দীপা। রাতে ফোন এলো দীপার।
-কী ব্যাপার বলতো? আনন্দ মেশানো গলায় প্রশ্ন ইফতির…।
-কী আবার ? বন্ধু তো বন্ধুকে উপহার দিতেই পারে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কি আছে? দীপা উত্তর দেয়।
নিয়মিত যোগাযোগ হতো না ওদের। হয়ত সপ্তাহে একবার। কিন্তু এই একটা বারের সুযোগটুকুর অপেক্ষা করত দুজনেই অধীর ভাবে। দুজনেই দুজনের সঙ্গ উপভোগ করে দারুনভাবে। ইফতি তখন কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। সারা দিন কোচিং ক্লাস আর দীপার চিন্তায় দিন কাটে তার। একই শহরে থাকলেও দীপার সাথে দেখা হওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। দীপার স্কুল এবং কোচিং এ ওর মা সাথে যান। কিছুই করার নেই। শুধু ফোনে কথা বলেই দিন কাটতে লাগল। ভালবাসার কথা মুখ ফুটে বলা হয়নি কারোরই, তবে দুজনেই দুজনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ভালমতই।
এক রাতে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না দীপা। অসহায় ভাবে নিজের ভালবাসা প্রকাশ করে ইফতির কাছে। ইফতিও কম ভালবাসে না দীপাকে। কিন্তু দীপা হিন্দু, আর ইফতি মুসলমান। ধর্মের বাঁধার কথা একটা বারের জন্যও মনে আসে না কারোর। অমোঘ নিয়তির কাছে নিজেদের ভবিষ্যৎকে সঁপে দিলো দুজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ভালো হল না ইফতির। খুব মুষড়ে পরল সে। বলতে গেলে দীপার একক আগ্রহে পরের বছর আবার পরীক্ষা দিলো ইফতি। এবারে ঠিকই সুযোগ পেল কিন্তু ঢাকা থেকে অনেক দূরে সিলেটে । এরই মধ্যে অনেক গুলো বছর পার হয়ে গেছে। দীপাও কলেজে ভর্তি হয়েছে। কষ্টে বুক বেঁধে বাবা-মা, পরিবার, দীপাকে ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলো ইফতি। যোগাযোগের জন্য কেবল মোবাইলটুকুই ভরসা। দীপা নিজের মোবাইল নেয় নি তখনও। তার বাবার ভয়ে যখন তখন ফোন করতেও পারে না ইফতি। কেবল মাত্র যখন দীপা মিসকল দেবে তখনই কথা বলা সম্ভব। ইফতি নিঃসঙ্গ জীবনে দীপাই একমাত্র আনন্দের উৎস। দীপাও বোঝে ব্যাপারটা। দীপার জীবনেও ছেলে বলতে কেবল ইফতিই। হাসি আনন্দ বেদনা সব মিলিয়ে বেশ চলতে লাগল ওদের জীবন। মাঝে মাঝে ঢাকা এলেও দীপার সাথে দেখা হওয়ার সৌভাগ্য হয় না ইফতির। এ নিয়ে অভিমান হলেও দীপার সমস্যার কথা ভেবে সে মেনে নিয়েছে। উচ্চমাধ্যমিকের পর তো দীপা হোস্টেলে থাকবে, তখন তো ইচ্ছে মতো দেখা করা যাবে, এই ভেবে সান্তনা নেয় ইফতি।
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা হয়ে গেলো দীপার। ওর খুব ইচ্ছা ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়ার। খুব ভালো ছাত্রী হয়েও বুয়েটে সুযোগ পেলো না দীপা। বাধ্য হয়ে রুয়েটে সুযোগ পেয়ে সেখানে ভর্তি হল দীপা। দুজনের ঠিকানা হল বাংলাদেশের দুই প্রান্তে। এখন নিজের মোবাইল নিয়েছে দীপা। রাজশাহী চলে যাওয়ার আগের রাতে ফোন করলো ইফতিকে।
-আমি তোমার কাছ থেকে আরও দূরে সরে গেলাম, তাই না? তুমি কি এতো দূরে কখনও আসবে আমাকে দেখতে ? কান্না ভেজা কণ্ঠে দীপা শুধায়।
-আরে পাগলি, তুমি দুনিয়ার যে প্রান্তেই থাকো না কেন, দেখো আমি ঠিক চলে আসব! কষ্ট চেপে হাসতে হাসতে বলে ইফতি।
শুরু হল দীপার হোস্টেল জীবন। ইফতি মুখে যতই বলুক এতোটা দূর আসবে ওর সাথে দেখা করতে, সেটা ভাবে নি দীপা। কিন্তু দীপাকে অবাক করে দিয়ে দুই সপ্তাহের মাথায় ঠিকই হাজির ইফতি। ইচ্ছে মতো রিকশায় ঘুরাঘুরি, খাওয়াদাওয়া করলো দুজন মিলে। এতোটা বছর পর ইফতিকে নিজের মতো করে পেয়েছে দীপা। ছাড়তে মন চায় না তার। কিন্তু ইফতিরও তো পড়াশোনা আছে। ৩ দিন পর আবার সিলেটে ফিরে যায় সে। মোবাইল এর কল্যাণে দূরত্ব বাধা হয় না ওদের প্রেমের কাছে। সারা দিন রাত কথা হয় আর সুযোগ পেলেই ইফতি ছুটে যায় দীপার কাছে। দীপার জন্য এটা ওটা কিনে পাঠাতে ভুল হয় না ইফতি। দীপাও যতটা পারে পাঠায়।
ইফতিকে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠিয়ে দিয়ে ক্লাসে যায় দীপা। সারাদিনের ব্যস্ত সময়েও ঠিকই খোঁজ নেয় আর ওর অগোছালো অভ্যাসের জন্য রাগ করে। ইফতিও যখনই যে অবস্থায় থাকুক দীপাকে একটু পরপর ফোন করতে ভোলে না। সারাদিন কি হল না হল সেটা না বলা পর্যন্ত যেন শান্তি পায় না কেউ। দু’জনের সারাদিনের ক্লান্তি শেষ হয় অনেক রাত অবধি এটা সেটা নিয়ে খুনসুটি করতে করতে।
মাঝে মাঝে দীপা ভবিষ্যতের কথা ভাবে। কী পরিনাম হবে এই সম্পর্কের ? ধর্মের বাঁধার কাছে অসহায় দুজনেই। বাবা-মাকে ছেড়ে আসার কথা ভাবতেও পারে না দীপা। ইফতি তো এগুলো ভাবতেই চায় না। তাকে বললে সে কেবল বলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কীভাবে ? জানে না দুজনের কেউ ই। ইফতি দীপার উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। ও যদি ছেড়ে চলে যায়, তাহলে ইফতির কী হবে তা ভাবতেও বুক কাঁপে দীপার। কিন্তু এভাবে কতো দিন? ভেবে কূল পায় না দীপা।
দিন যায়, বছর যায়। মাঝে মাঝে ছোট ছোট অভিমান যখন ঝগড়ায় রূপ নেয়, তখন দীপা বলে ওঠে আমি আর সম্পর্ক রাখব না তোমার সাথে। তবে রাগের ধাক্কা কেটে গেলে আবার দীপাই ঠিকঠাক করে সব । পরম আদরে কাছে টেনে নেয় ইফতিকে।
পরেরবার রাজশাহী গিয়ে ইফতি টের পায় যে সব কিছু আগের মতো নেই। কোথায় যেন সুর কেটে যেতে শুরু করেছে। রিকশায় ইফতির হাতে নিজের হাত রেখে দূর দিগন্তে তাকিয়ে আনমনা হয়ে বসে থাকে দীপা। ইফতি জিজ্ঞাসা করে কী হয়েছে। চমকে উঠে দীপা বলে- কই, কিছু না তো!
চিন্তিত ইফতি সিলেটে ফিরে আসে। বার বার দীপাকে জিজ্ঞাসা করেও কোন উত্তর পায় না সে। সব কিছু চলতে লাগল আগের মতোই।
একদিন আচমকাই সিদ্ধান্তটা এলো। দীপা ফোন করে ইফতিকে জানিয়ে দেয় যে তার পক্ষে আর সম্পর্কটা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না। হতবাক হয়ে যায় ইফতি। না, কেবল ধর্মের বৈরিতা নয়, তাদের মধ্যে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল অন্য কেউ। সুজয় এর কথা আগেও জানত ইফতি। কিন্তু শুধুই দীপার বন্ধু বলে জানত। মাঝে মাঝে দীপার সাথে ফোনে কথা হতো। সেই সুজয় দীপাকে ক’দিন আগে প্রপোজ করেছিল । কিন্তু দীপা সুজয়কে কেবল বন্ধু হিসেবে দেখত বলে ফিরিয়ে দিয়েছিল। এই সব কথাই ইফতিকেই বলেছিল দীপা। কিন্তু আজ দীপা ইফতিকে জানিয়ে দেয় যে সে এখন সুজয় কে খুব বেশি ফীল করছে এবং আজ রাতে সে সুজয় কে প্রপোজ করবে। দীপা খুব খুশি হবে যদি ইফতি ওকে আর ফোন না দেয়।
ইফতি পারেনি নিজেকে শক্ত রাখতে। অসহায় ভাবে ভেঙ্গে পড়ে দীপার কাছে নিজের প্রেম ভিক্ষা চেয়েছিল। কিন্তু না, দীপা ফিরে আসেনি আর।
দীপা চলে গেছে আজ অনেক দিন। প্রায় বছর ঘুরতে চলল। দীপা আর কোনোদিনই ফোন দেয়নি ইফতিকে। সুজয়ের সাথে ভালমতই প্রেম চলছে সে খবরও পেয়েছে ইফতি। যাওয়ার সময় দীপা বলে গিয়েছিলো ইফতি যেন ওকে ভুলে যায়। ইফতিকে আর মনেই পড়ে না দীপার। কিন্তু ইফতি ভুলতে পারেনি দীপাকে। ঈশ্বর ইফতিকে ভালবাসার ক্ষমতা দিয়েছেন, কিন্তু ভুলতে পারার ক্ষমতা দেননি।
সেদিনের পর থেকে আর কোনোদিন রাতে ঘুমোতে পারেনি ইফতি। ও জানত দীপার সাথে ওর বিয়ে হওয়াটা প্রায় অসম্ভব ছিল। নিয়তির কাছে পরাজিত হলেও তা মেনে নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করত সে। কিন্তু এতগুলো বছরের ভালবাসা নিয়ে মাত্র কয়েকদিনের ভালবাসার কাছে হেরে গিয়ে এখন বোবা হয়ে গেছে ইফতি।

ভালোবাসার গল্প ( নিতির নিয়তি )

দক্ষিনের জানালাটা খোলাই ছিল। নিতির মনের জানালা যেমন খোলাই থাকে প্রতিনিয়ত তার অজানা অপ্রাপ্ত ভালবাসার জন্য। গত ছয় মাস ধরে সে জানালা পেরিয়ে অজানা এক ভায়োলিনের সুর ভেসে এসে নিতির হৃদয়কে আচ্ছন্য করে যায় এক অজানা শিহরনে।
শান্তিনগরের বিশাল ফ্লাটবাড়ি। রাজধানীর ব্যস্ততম আবাসিক এলাকা। অজস্র মানুসের বাস। কিন্তু কে যে নিতির মনকে রোজ সন্ধায় আলো জাগিয়ে যায় আজো তার জানা নেই। তাই অজস্র লোকের ভিড়ে তার চোঁখ খুঁজে ফিরে সেই মুখটি দেখার আশায় যার ভায়োলিনের সুর তাকে এমন আবেশি করে যায়।
প্রায় চল্লিশটি ফ্লাট। কিন্তু কোথায় থাকে তার সেই মনের মানুষ যাকে সে অজান্তে সঁপে দিয়েছে তার কুমারি মন। নিতি খোঁজে। যতই খোঁজে ততই বাড়ে মনের ব্যাকুলতা।
দিন যায় ব্যাকুলতা বাড়ে। এক বৃষ্টিস্নাত সন্ধায় নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনা নিতি। আজো রোজকার মত ভেসে আসছে সেই সুর। কিন্তু আজ যেন বড়ই অন্যরকম। বৃষ্টি আর ভায়োলিনের সুর এক হয়ে মধুর সুর হয়ে বাজছে নিতির মনে। নিতিকে এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে সে সুর। আজ নিতি মরিয়া হয়ে ওঠে। তাকে আজ খুঁজে বের করতেই হবে কোথায় থাকে তার সেই অজানা মনের মানুষ। অজান্তেই যাকে করে তুলেছে সে নিজের সপ্নের রাজপুত্র।
পাগল হয়ে ওঠে নিতি ফ্লাট থেকে ফ্লাটে ঘোরে, কান পেতে শোনার চেষ্টা করে, বোঝার চেষ্টা করে কোথায় বাজছে সে সুর, যাতে আটকা পরেছে তার অমোঘ নিয়তি। অনেক খোঁজার পরে পেয়ে যায় সে। তাদের দুই ফ্লোর নিচে ঠিক তাদের বরাবর ফ্লাটটি থেকেই ভেসে আসছে সেই সুর। নিতি উদ্ভ্রান্তের মত বেল বাঁজাতে থাকে।
মাঝবয়সী এক ভদ্রমহিলা দরজা খুলে উঁকি মারে।
ভদ্রমহিলা: কাকে চাইছেন?
নিতি: আসসালামুয়ালাইকুম। আসলে আমি আপনাদের ঠিক দুই ফ্লোর উপরে থাকি। আমার নাম নিতি।
ভদ্রমহিলা: ( স্মিত হাসি দিয়ে ) আচ্ছা তাই। তা কি মনে করে, কোনো কাজ নাকি এমনি পরিচিত হতে?
নিতি: ( আমতা আমতা করে ) না আসলে, আমি আরকি, খালাম্মা, আসলে……
ভদ্রমহিলা: আরে দেখ দেখি কি কাণ্ড তোমাকে বাহিরে দাঁড় করিয়ে রেখেছি। এসো ভেতরে এসো। তুমি বললাম রাগ করলে নাতো। ( স্মিত হাসিটি লেগেই আছে )।
নিতি: (ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে) না না কি যে বলেন না খালাম্মা? (লাজুক হেসে) আমি তো আপনার মেয়ের মতোই। (মনে মনে বলছে নিতি: আপনার ছেলে যদি ভায়োলিনটা বাজিয়ে থাকে তবে তো আপনাকে মা ডাকতেই হবে)।
ভদ্রমহিলা নিতিকে বসার ঘরে নিয়ে এলেন। নিতি চারদিকে তাকিয়ে বসার ঘরটি দেখছে আর ভদ্রমহিলার রুচির প্রসংসা করছে মনে মনে। এদিক ওদিক চকিত চাহ্নি দিয়ে বজার চেষ্টা করছে যে সুরটি এখনো বাজাচ্ছে সে কোন ঘরে? তাকে কখন সে দেখতে পাবে? কখন সে তার মনের রাজপুত্রর চোখে চোখ রাখতে পারবে? কখন সে তাকে বলবে যে ভালবাসার কথা আমি শুধু শুনে এসেছি সে ভালবাসা ভায়োলিনের সুর হয়ে ঢুকে গেছে আমার মনে। নিতি ভাবছে সকল লজ্জা সকল নিয়ম ভেঙ্গে সে আজ জানাবে যে তার অদেখা রাজপুত্রকে সে কতটা ভালবেসে ফেলেছে। তার কতটা জুরে আছে সে ভালবাসার মানুষটি। যার একটু সম্মতির জন্য নিতি যেকোন বন্ধন ছিন্ন করতেও আজ প্রস্তুত। কিন্তু কোথায় সেই মানুষটি সে আসছে না কেন?
ভদ্রমহিলা যার নাম সালেহা তিনি দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখছেন মগ্ন নিতিকে। আনমনা দাড়িয়ে সোফার কোনটি ধরে এদিক ওদিক দৃষ্টি বোলাচ্ছে। তিনি চমক ভাঙ্গালেন নিতির-
সালেহা বেগম: কি মা? কি দেখছ অমন করে? বসো একটু। কি খাবে বলো হাল্কা না ভারী কিছু?
নিতি: না না খালাম্মা কিছু খাব না আমি…… ( অপ্রস্তুত হয়ে হরবরিয়ে বলে ওঠে নিতি )
সালেহা বেগম: আরে লজ্জা করোনা এম্নিতে নাস্তার সময় এখন, আমিও নাস্তা করবো। কি খাবে বলো?
নিতি: হাল্কা কিছু হলেই হবে। ( না করার আর শক্তি পায় না নিতি )
সালেহা বেগম উঠে গেলেন রান্নাঘরে। ভায়োলিনের সুর হঠাৎ থেমে গেলো। নিতি চমকে উঠলো কিন্তু খুশীও হোল। ভাবলো যাক এবার তবে রাজপুত্রের দেখা মিলবে। কেমন হবে সে? ভালবাসবেতো আমায়? আমায় সুন্দর লাগছেতো? যাহ্ একটু সাঁজ করে আসলে কি হতো? এমনি নানান ভাবনায় রোমাঞ্চিত হয়ে থাকল নিতি।
সালেহা বেগম কিছুক্ষন পরে বসার ঘরে এসে ঢুকলেন পেছন পেছন কাজের ছেলে ট্রলি ঠেলে ঢুকছে। নিতি চেয়ে রইল, কই সে তো এল না? এখনো আসছে না কেন? আবার মগ্নতা ভাঙ্গালেন সালেহা বেগম –
সালেহা বেগম: এই মেয়ে কি এত ভাবো সারাক্ষন অমন করে? এই বয়সে মেয়েদের এত চিন্তা করতে হয়না। চেহারার সৌন্দর্য আর লাবণ্য নষ্ট হয়ে যাবে তো, মাসাল্লাহ, কি সুন্দর মেয়েগো তুমি। (প্রশ্রয় মাখা হাসি তার মুখে )
নিতি: ( লজ্জা পেয়ে ) নাহ এমনি, একা বসে ছিলাম তো তাই। ( এদিক ওদিক তাকিয়ে ) আচ্ছা আর কাউকে দেখছি না যে?
সালেহা বেগম: ( কিছুটা কৌতূহলী হয়ে ) কেনো আর কে থাকবে? ( কিছুটা মজা করে ) আর কাউকে আশা করছো, কারো কি আসবার কথা নাকি?
নিতি: ( লজ্জায় মাথা নিচু করে ) ঐযে এতক্ষন যিনি মনকারা সুরে ভায়োলিন বাজাচ্ছিলেন। অসাধারন সুর। তাকেও ডাকুন একসাথে নাস্তা করি। এমন একজন গুনি মানুষের সাথে পরিচিত হতে পারাটাওতো সৌভাগ্যের ব্যাপার।
নিতির কথা শুনে হঠাৎ করে সালেহা বেগমের চেহারা করুন হয়ে গেল। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তার সকল জিবনিশক্তি যেনো তাকে ছেড়ে হঠাৎ চলে গেছে। নিতি বিষয়টি খেয়াল করলো। তার মনে অজানা আশঙ্কা উদ্রেক হলো।
নিতি: ( নিতির গলায় অস্থিরতা ) কি হয়েছে খালাম্মা? অমন করছেন কেনো? আমি কি আপনার কোথাও না জেনে আঘাত দিয়ে বসলাম? ( উত্তেজনায় ছটফট করছে নিতি )
সালেহা বেগম: ( দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে ) না মা। তুমি আমাকে কি আঘাত দেবে! যা আঘাত পাবার তা সাত মাস আগেই পেয়েছি। এখন শুধু আঘাতের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা।
নিতি: ( হতবাক হয়ে ) মানে? কি বলছেন খালাম্মা এসব? কি হয়েছে বলেন একটু? ( চরম হতাশা বাজছে নিতির কণ্ঠে )
সালেহা বেগম: (কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে) ভায়োলিনের যে সুরের কথা বলছ তুমি ওটা আমার ছেলে পিয়েল এর বাজানো। ও ভালো বাজাতো বলে এক রেকর্ড কোম্পানি ওকে অ্যালবাম করার সুযোগ দেয়। যেদিন রেকর্ডিঙের কাজ সম্পূর্ণ শেষ হয়, আমরা একটা সেলিব্রেসন এর পার্টি রাখি। পিয়েল পার্টিতে আসার জন্য খুব দ্রুত গাড়ী চালাতে থাকে। এক পর্যায়ে ওর এক্সিডেন্ট হয়। ঘটনাস্থলেই ওর মৃত্যু ঘটে। কিছুদিন পরে রেকর্ডিং কোম্পানি অ্যালবাম এর কয়েকটা কপি আর রয়্যালিটির টাকা দিয়ে যায়। আগের বাসায় ওর স্মৃতি তাড়া করতো খুব বেশি তাই ছয় মাস হয় এই ফ্লাট কিনে এখানে শিফট করেছি। এখানে আসার পর থেকে পিয়েলের ভায়োলিনের আওয়াজ মিস করতাম তাই ওর অ্যালবামটা প্রতি সন্ধায় শুনতাম। ওর প্রতি আমার ভালবাসার ক্ষুদ্র প্রদর্শন।
নিতির মাথায় যেনো আকাশ ভেঙ্গে পরে। পায়ের তলায় মাটি যেন সরে যেতে চায়। বাবা মায়ের আদুরে মেয়ে নিতির কাছে সমস্ত বিশ্ব একটি খালি শূন্য স্থান মনে হয়। নিজের কানকে বিশ্বাস হয় না। এ সে কি শুনছে; যে ভায়োলিনের আওয়াজ তার মনে বসন্তের দোলা দিয়ে গেছে, যাকে দেখার জন্য যাকে ভালবাসার জন্য নিতির সকল সত্তা আজ উম্মুখ, সে আজ তবে আর হবার নয়??? যে সুর শুনে সে ভালবাসতে শিখেছিল তা কেবল রেকর্ডকৃত!?! তবে সে শুধুই এক ছেলেহারা মায়ের কষ্ট মেটাতে বাজতো? এ সে কি করলো, কাকে ভালবাসল??? এখন সে এই মৃত পিয়েলকে পাবে কোথায়??? শুধু কারো রেখে যাওয়া স্মৃতিকে সে নিজের ভালবাসা বানিয়েছে??? এমনি অজস্র প্রশ্ন নিয়ে বসে থাকে নিতি। কিছু পাবার আগেই হারিয়ে ফেলার বেদনা তাকে স্থবির করে দিয়ে যায়।
পাবার আগেই সবকিছু হারিয়ে ফেলা এক তরুণী আর স্মৃতি হাতড়ে ফেরা এক রমণীর পাশাপাশি বসে থেকেও নিজেদের সবহারা নিঃসঙ্গ মনে হয়। খাবারগুলো তেমনি পরে থাকে। শূন্য দৃষ্টিতে বসে থাকা দুটি মানুষের হৃদয়ের হাহাকার এক হয়ে মিশে যেতে থাকে বাহিরের বৃষ্টির হুঙ্কারের সাথে। প্রকৃতিও আজ কাঁদতে থাকে তাদের সাথে অঝোর ধারায়।

ভালোবাসার গল্প ( মাঝ রাতের ট্রেন এবং নিঃসঙ্গ প্রেম )

রাত ৮ টা।
লাকসাম রেলওয়ে জংশন।
মুহিন একটা ফ্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা বেনসন সিগারেট। একটু পর পর লম্বা টান দিচ্ছে সিগারেটে আর এদিক সেদিক তাকাচ্ছে সে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে বিরাট বড় বিপদে পড়েছে তাই ভিরু চোখে এদিক সেদিক সাহায্যের আশায় তাকাচ্ছে।
একটু আগে হালকা বৃষ্টি হয়েছিল। এখন বৃষ্টি নেই। আকাশে কাল মেঘ আর পূর্ণিমার চাঁদের লুকচুরি খেলা। স্টেশান থেকে একটু দূরেই বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ আর জলা ভুমি। চাঁদের আলো পড়ে কি অপরূপ সুন্দর লাগছে!
আর সব স্টেশানের মতই এই স্টেশানে অনেক কোলাহল। দুই তিনটা ট্রেন দাড়িয়ে আছে বিভিন্ন লাইনে। হকারদের কোলাহলে স্টেশান মুখরিত। স্টেশানের হলুদ আলো মুহিনের খুব ভাল লাগে। কেমন যেন একটা ঘোর অনুভব করে মুহিন। সে এদিক সেদিক চেয়ে একটা লোহার বেঞ্চির দিকে এগিয়ে যায়।
মুহিনের বয়স বেশি না। মাত্র ২৪ বছর।
সে পেশায় একজন নাবিক। সমুদ্রগামী বাণিজ্যিক জাহাজে চাকুরি করে। ছুটিতে সে দেশে এসেছে। সে ঠিক করেছে যে এইবার দেশে পুরো ৩ মাস ছুটি কাটাবে।
মুহিন একজন ছন্নছাড়া টাইপের ছেলে। কখন কি করে তার ঠিক নেই। আজ সকালেও সব ঠিক ছিল। বিকালের দিকে কি মনে হল তার কে জানে- হটাৎ মাকে বলল যে আজ রাতে বাসায় ফিরবে না। এক বন্ধুর বাসায় থাকবে।
তারপর বাসা থেকে সোজা স্টেশানে। সে নিজেও জানে না সে কথায় যাবে, কেন যাবে। তার আজ হটাৎ মনে হল একটু বেরিয়ে পড়া যাক। যে দিকে দুচোখ যায়। এমনি পাগল আমাদের মুহিন!
কেন সে মাঝে মাঝে এই পাগলামি করে এটা তার কাছে পরিস্কার না। হয়ত তার মনে কোন কষ্ট আছে কিংবা জমা আছে কোন ক্ষোভ যা কষ্টের চেয়েও বেশি পীড়া দেয় তাকে।
লোহার বেঞ্চিতে বসে পায়ের উপর পা দিয়ে বসল। জিন্সের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে আরেকটা সিগারেট ধরাল। তারপর উদাস দৃষ্টিতে তার চারপাশের মানুষগুলকে দেখতে লাগলো।
একটা আন্তঃনগর ট্রেন একটা লাইনের উপর থেমে আছে। একটু পরে মনে হয় ছেড়ে দিবে। যাত্রীরা আস্তে আস্তে ট্রেনে উঠছে। কেউবা দাড়িয়ে আছে দরজার পাশে। কেউ ট্রেন থেকে নেমে এই সুযোগে একটা সিগারেট খেয়ে নিচ্ছে। হকাররা ট্রেনের জানালার কাছে গিয়ে হাঁকাহাঁকি করছে- “এই কেক খান, পানি খান”!
আজকে মনে হয় মানুষ কম ট্রেনে। অবশ্য কম হবারই কথা। সপ্তাহের মাঝের একটা দিন আজ। বৃহস্পতিবার, শুক্রবার আর শনিবারে যাত্রী বেশি থাকে- সপ্তাহের অন্য দিনগুলো মানুষের ভীড় একটু কম থাকে। আজ তেমনি একটা দিন।
মুহিনের বিভিন্ন মানুষের জীবন যাত্রা দেখতে ভাল লাগে খুব। এই যে একটা ফকির তার পাশের বেঞ্ছিতে বসে এক মনে বিড়ি খেয়ে যাচ্ছে-এটা দেখতেও তার ভাল লাগছে, ঐযে একটা কিশোর ছেলে পানির গ্যালন হাতে নিয়ে পানি বিক্রি করছে এটাও ভাল লাগছে তার। মানুষের জীবন কি অদ্ভুত। সে তথাকথিত ভদ্র সমাজে থেকে ক্লান্ত হয়ে গেছে।
মুহিনের ইচ্ছে করে এই মানুষগুলোর সাথে যদি কিছুদিন কাটানো যেত! ইশ!! মুহিন মুগ্ধ চোখ তাকিয়ে দেখছে এই জীবন গুলোর জীবন প্রণালি।
হটাৎ একটা মিষ্টি সুরে চিন্তার ঘোর কাটে মুহিনের।
-ভাইয়া, একটু শুনেন।
মুহিন তাকিয়ে দেখে একটা মেয়ে!
হুম। শুধু মেয়ে বললে ভুল হবে মুহিনের। বলতে হবে এভাবে যে- একটা মেয়ে যার মুখে অসম্ভব রকমের মায়া আছে। ভীত হরিণীর মত কাজল দিয়ে ভরা দুটি চোখ। ভাবুক মুহিন অপলক চোখে তাকিয়ে আছে মেয়েটির দিকে। মেয়েদের দিকে এভাবে তাকানোটা মুহিনের স্বভাব বিরুদ্ধ তবুও এই অদ্ভুত পরিবেশে মেয়েটিকে যেন তার খুব মনে ধরেছে।
মেয়েটি আবার বলল-ভাইয়া, একটু শুনেন না।
-ও হ্যাঁ, দুঃখিত। কি জানতে চান বলুন। মুহিন একটু অপ্রস্তুত হয়ে জবাব দিল।
মেয়েটি বলল-ভাইয়া, এখানে তো দুটা ট্রেন। আমার ট্রেন কোনটা বুঝতে পারছি না। আমি ট্রেন থেকে নেমে একটু হাটতে বের হয়েছিলাম।
মুহিন বলল- ও আচ্ছা। এটা তো কোন সমস্যা না। আপনার ট্রেনের নাম মনে আছে?
মেয়েটি জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলল- হুম। মেঘনা এক্সপ্রেস।
মুহিন হেসে বলল-আরে এত জোরে মাথা নাড়েন কেন? মাথা তো ছিঁড়ে পড়ে যাবে।
মেয়ে বলল- কি করব ভাইয়া। ভয় পেলে আমার এমন হয়।
মুহিন আবার হেসে বলল- আরে ভয় পাওয়ার কি আছে? ট্রেন তো মোটে এখানে দুটা। একটা না হলে শিউর অন্যটা। দাঁড়ান আমি দেখতেসি। আসেন আমার সাথে।
মুহিন উঠে দাঁড়াল। তারপর একটা ট্রেনের দিকে হাটা ধরল। মেয়েটিও তার পেছন পেছন আসছে। বেচারি মনে হয় একটু বেশি ভয় পেয়েছে। তাই মুহিনের পিছনে শরীর ঘেঁষে হাঁটছে।
মুহিনের কেন যেন মনে হল- মেয়েটি তার সার্টের একটা কোনা ধরে রেখেচে আলতো করে। মেয়েটি হয়ত ভাবছে যে মেয়েটি হারিয়ে যাবে। মুহিনের চেহারায় কি এমন কিছু আছে যে কারনে সবাই তাকে দেখা মাত্রই বিশ্বাস করে। যেমন এই মেয়েটি করেছে। এই জিনিসটা মুহিনের খুব খারাপ লাগে। মানুষ তাকে এত বিশ্বাস করে যে মুহিন চাইলেই কারও বিশ্বাস ভাংতে পারে না। মুহিনকে যারা বিশ্বাস করেছে কারও বিশ্বাস নষ্ট করেনি মুহিন তবুও সবাই কেন মুহিনের বিশ্বাস ভাঙ্গে?
মুহিন একটা ট্রেনের কাছে গিয়ে একটা ভদ্র লোককে জিজ্ঞাস করল-ভাই এটা কি মেঘনা এক্সপ্রেস?
লোকটি মাথা না ঘুরিয়ে বলল- হ, আপনে যাইবেন কই?
মুহিন লোকটির কথা জবাব না দিয়ে মেয়েটির দিকে ফিরে জিজ্ঞাস করল- কত নং বগি মনে আছে?
মেয়েটি অসহায় গলায় বলল- না তো। তবে মধ্য দিকের একটা বগি হবে।
মুহিনের মেজাজ খুব খারাপ হল। বলল- আজব টিকিট দেখেন নাই আপনি? কোন বগিতে উঠছেন সেটা না জেনে নামলেন কেন?
মেয়েটি ভিরু গলায় বলল- ধমক দিচ্ছেন আমাকে? আমি তো টিকিট করিনি। টিকিট করেছে আমার বান্ধবি। আমরা একসাথে বাড়ি যাচ্ছি তো। ও ট্রেনের সিটেই আছে।
মুহিন বলল- তাই বলে আপনি একটু টিকিট দেখবেন না? আচ্ছা চলেন খুঁজে দেখি আপনার বান্ধবিকে।
তারপর দুজন ট্রেনে উঠল। বাহ! বাহির থেকে মনে হচ্ছিল যে ট্রেনে বুঝি ভীড় কম। এখন দেখা যাচ্ছে যে ভিড় আছে খারাপ না।
মুহিন আর মেয়েটি সামনের দিকে একটা কামরায় উঠেছিল। তাই তারা ট্রেনের সামনে থেকে পিছনের দিকে চলল।
বাহ! মেয়েটা এইবার তার জামা ধরল না। সোজা মুহিনের হাত ধরল শক্ত করে। এই চিকন শরীরে এত শক্তি কোথা থেকে আসলো? বিপদে পড়লে বুঝি এমনি হয়!
কত দিন পরে কোন মেয়ে মুহিনের হাত ধরল? শেষ যে মেয়েটি অনেক ভালবাসা নিয়ে মুহিনের হাত ধরেছিল সে মেয়েটির কথা মনে হতেই একটা বিষণ্ণতা অনুভব করল মুহিন। সাথে একটু কষ্ট- একটু না। অনেক কষ্ট অনুভব করল মুহিন।
একটা বগিতে ঢুকেই মেয়েটি মুহিনের হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে চীৎকার দিয়ে একটা মেয়ের দিকে ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। মুহিন বুঝতে পারল এটা মেয়েটির বান্ধবি। বান্ধবিকে একটু বুদ্ধিমতি মনে হচ্ছে।
মুহিন সেই বান্ধবিকে বলল- আপনার বন্ধু তো আজ এখানে হারিয়ে গিয়েছিল। এত বোকা মেয়েকে ছাড়েন কেন একা একা?
বুদ্ধিমতি বান্ধবি বুঝে নিল যে মুহিনই ওর বান্ধবিকে ট্রেন খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে।
মেয়েটি হেসে বলল- হারিয়ে ভাল করেছে। তা না হলে আপনার সাথে ওর দেখা হত কই?
বাপরে! একেবারে রেডি উত্তর। মুহিন অপ্রস্তুত হয়ে গেল। হারিয়ে যাওয়া মেয়েটিও বেশি অপ্রস্তুত হল। বান্ধবির পিঠে একটা কিল মেয়ে হারিয়ে যাওয়া মেয়েটি বলল- যাহ্! তুই সব সময় একটু বেশি বুঝিস।
বুদ্ধিমতি বান্ধবীটি বলল-আমি যা বুঝি ঠিকই বুঝি। হুম ভাইয়া। ও নিশ্চয়ই ওর নাম বলে নাই। যাই হোক ওর নাম বর্ষা আর আমি নিতু। আমরা একটা ভার্সিটিতে একসাথে পড়ি। আমাদের বাড়ি একজায়গায়। ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছি। এই বার ঝটপট আপনার পরিচয় দেন- তা না হলে ট্রেন ছেড়ে দিবে একটু পর।
বাপরে। মেয়েত পুরা বুলেট। মুহিন নিজের পরিচয় দিয়ে বলল- আপনারা ভাল থাকেন। আমি যাই।
মুহিন বিদায় নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে এল। চলে যাচ্ছে এমন সময় পিছন থেকে নিতু মেয়েটি জানালা থেকে ডাক দিল- ভাইয়া একটু শুনেন।
মুহিন জানালার কাছে গেল। মেয়েটি বলল- ভাইয়া, আর তো কখনো দেখা হবে না। আপনি চাইলে আমাদের ফোন নং নিতে পারেন।
মুহিন তাকিয়ে দেখল-নিতুর পেছন থেকে বর্ষা মেয়েটা উঁকি দিচ্ছে। লজ্জা পেয়ে সামনে আসতে চাইছে না।
মুহিন বলল- দরকার কি? থাকুক না। বেঁচে থাকলে অবশ্যই আবার দেখা হবে।
নিতু নিরাশ হল। বলল- ঠিক আছে ভাইয়া। আপনি ভাল থাকবেন।
মুহিন বলল- আপনারাও ভাল থাকবেন।
ট্রেনটির হুইসেল বেজে উঠল কুউ করে। মুহিনের মনটা হটাৎ বিষণ্ণতায় ভরে গেল। মেয়ে দুটো চলে যাবে এখনি। আর হয়ত আর জীবনেও তাদের সাথে দেখা হবে না তার। তবুও মেয়েটির জন্য কি অদ্ভুত টান অনুভব করছে সে! কিন্তু প্রকাশ করছে না সে।
ট্রেনটি আস্তে আস্তে চলা শুরু করল। নিতুর সাথে বর্ষাও জানালার পাসে এসে দাঁড়াল। মেয়েটির চোখেও কেমন একটা ব্যাকুলতা দেখতে পেল মুহিন।
ট্রেনটা কিছুদূর চলে গেছে। বর্ষা ট্রেনের জানালা দিয়ে মাথা বের করে মুহিনের দিকে তাকিয়ে আছে। ট্রেনটি আরও জোরে চলা শুরু করেছে। মুহিন দেখল মেয়েটি জানালা দিয়ে হাত বের করে দিয়ে হাত নাড়ছে। মুহিন ও প্রতিত্তুরে হাত নেড়ে দেখাল। মেয়েটির ট্রেন একসময় হারিয়ে গেল অন্ধকারে।
তবুও মুহিন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেই দিকে।
মুহিন বুকের মধ্যে চিনচিন একটা বেথা অনুভব করল মেয়েটির জন্য। মুহিন আবারও ভাবল কি সুন্দর আমাদের জীবন কি অদ্ভুত সুন্দর আমাদের জীবন! ছোট ছোট কত ভালবাসায় ঘেরা আমাদের এই জীবন!
আকাশে আবার মেঘ জমেছে। কাল মেঘে আকাশের চাঁদ ঢেকে গেছে। বাতাসের প্রকৃতি দেখে অভিজ্ঞ নাবিক মুহিন বুঝল আবার বৃষ্টি হবে একটু পরে।
মুহিন ঘুরে দাঁড়াল। একটা খোলা চায়ের দোকানে বসে এক কাপ চা নিল। আগুন গরম ধোঁয়া উঠা গরম চা। তৃপ্তি ভরা চুমুক দেবার আগেই শুরু হল ঝুপ বৃষ্টি। আর সাথে সাথে স্টেশানের মানুষ গুলো ছুটতে শুরু করল নিরাপদ আশ্রয়ে।
খুব সাধারন একটা দৃশ্য, তবুও মুহিনের খুব ভাল লাগলো। মুহিনের গালে বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছে। মুহিন তৃপ্তি নিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিল। অসাধারন লাগলো চায়ের স্বাদ। তার মনে হল সে কল্পনার এক জগতে চলে এসেছে।
রাত ১১ টা।
কিছুক্ষণ আগেই বৃষ্টি শেষ হয়েছে।
মুহিন দাড়িয়ে আছে। কি করবে এখনো ঠিক করে নাই সে। বাসায় ফিরতে পারে কিংবা লাইনে দাঁড়ানো একটা ট্রেনে টুপ করে উঠে যেতে পারে সে। কি করবে বুঝতে পারছে না। আজ নিজেকে মুক্ত স্বাধীন মনে হচ্ছে।
সিগারেট শেষ তার। তাই একটা দোকান থেকে এক প্যাকেট বেনসন কিনল সে।
আকাশে মেঘের ফাঁক দিয়ে আবার চাঁদ উঠেছে। মুহিন একটা ট্রেন লাইনের পাশ দিয়ে হাটা ধরল। খুব সুন্দর বাতাস ভেজা বয়ে যাচ্ছে। বাতাসে তার লম্বা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। মুহিন চাঁদের মৃদু আলোয় পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কথায় যাচ্ছে সে নিজেও জানে না।
একটা ট্রেন স্তেশান থেকে ছেড়ে আসছে তার পিছন দিক থেকে। সে পেছন ফিরে তাকাল।
ছোট একটা ট্রেন, অন্ধকার হয়ে আছে, ট্রেনের গতি মন্থর। মুহিন বুঝল এটা একটা লোকাল ট্রেন।
ট্রেনটা তার পাশ দিয়ে যাবার সময় সে হটাৎ কি মনে করে ট্রেনের হ্যান্ডেল ধরে উঠে পড়ল।
ট্রেনের কামরায় নিকষ কাল অন্ধকার। হটাৎ করে কামরায় ঢুকে চোখে আঁধার দেখল মুহিন। একটু পরে যখন আঁধার চোখ সয়ে গেল দেখতে পেল যে কে যেন একটা মোম জ্বেলে রেখেছে। বাতাসে মোমের শিখা তিরতির করে কাঁপছে। সে মোমের আবছা আলোয় দেখল এই বগিতে যাত্রী বেশি নেই। ১০/১৫ জন হবে। সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে, কেউবা সিটে লম্বা হয়ে ঘুমাচ্ছে।
মুহিন একটা খালি সিট দেখে জানালার পাশে গিয়ে বসল। জানাল দিয়ে বৃষ্টি ভেজা বাতাস আসছে হু হু করে। সে একটা হাত বাড়িয়ে দিল জানালা দিয়ে। ভেজা বাতাস তার খোলা হাত ছুয়ে যাচ্ছে, হাতের খোলা অংশে ভেজা বাতাস লাগতেই তার শরীরে কাঁটা দিয়ে গেল। আবেশে চোখ বুজে এল তার।
জানালার মধ্যে হাত রেখে হাতের উপর মাথা রেখে বাইরের দিকে তাকাল।
বাইরে কি সুন্দর দৃশ্য! দিগন্ত জোড়া ধানের ক্ষেত বাইরে। কাল মেঘের ফাঁক দিয়ে পূর্ণিমার চাঁদ উকিঝুকি মারছে। সে অন্ধকার মেশানো চাঁদের আলোয় ভেসে গেছে সে দিগন্ত জোড়া ধান খেত, খাল, ঘুমন্ত বাড়ি ঘর!
পুকুর আর খালের পানিতে বৃষ্টির পানিতে সে চাঁদের আলো পড়ে হিরে মানিকের মত জ্বলজ্বল করছে। কি অসাধারন এক দৃশ্য!
হটাৎ একটা শ্লেষ মেশানো গলায় মুহিনের চিন্তার সুত্র ছিঁড়ে গেল।
-ভাইজান, আপনে কই যাইবেন?
মুহিন ঘাড় ফিরিয়ে দেখে একজন মাঝ বয়সি মানুষ। মুখে দাড়ি গোঁফের জঙ্গল।
সে তাকে পাল্টা প্রশ্ন করল- এই ট্রেন কোথায় যাবে?
লোকটি মুহিনের প্রশ্ন পালটা শুনে একটু অবাক হল। বলল- আপনে জানেন না এই ট্রেন কই যাইব? তাইলে উঠছেন ক্যান?
মুহিন বলল- দেখেন, আমি আজ ঘুরতে বের হইচি। কোথায় যাব ঠিক জানি না। তাই ট্রেন কই যাবে জানার আগ্রহ নাই। যেখানে ট্রেন থামবে সেখানে নেমে যাব।
লোকটি তার কথায় একটু অবাক হল মনে হয়। সে মুহিনের সামনের খালি সিটে বসে পড়ল। তারপর বলল- ও আচ্চা। বুঝতে পারছি। ভাল কাজ করছেন। আসলেই আমরা কেউ জানি না আমরা কোথায় যাচ্ছি!
মুহিন এই লোকের মুখে এত বড় দার্শনিক কথা শুনে একটু অবাক হল। সে লোকটার দিকে একটু ভাল করে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল- আপনি কই যাবেন?
লোকটি এক গাল হেসে বলল- আমিও আপনের মত কই যাই ঠিক নাই, আমার জীবন এই ঘুরে ঘুরেই কাটে। স্থায়ি কোন বসতি নাই।
একটু চুপ করে আবার বলল-ভাইজান আমার নাম আজিজ। কেউ কয় আজিজ বয়াতি, কেউ কয় আজিজ পাগলা, আমার কেউ কয় মজনু আজিজ। আমার নাম মজনু আজিজ ক্যান- ভাইজান কি জানেন?
মুহিন বিরস গলায় বলল- না জানি না। জানার ইচ্ছে হচ্ছে না।
মজনু আজিজ একটু বিষণ্ণ হল বুঝা গেল। সে আবার বলল- ভাইজান সে এক মজার হিস্টরি। তয় আমার কাছে সেটা দুক্ষের হিস্টরি। একজনের কাছে যা মজার আরেকজনের কাছে তা দুক্ষের। ঠিক বলেছিনা ভাইজান?
উফ! লোকটা বকবক করে মাথা ধরিয়া দিল। মুহিন আবার বলল- আপনি ঠিক বলেছেন। শুনেন ভাই- আমি একটু একা থাকব বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছি। আপনে এখন যান।
আজিজ বিরস গলায় বলল- শুনলে মজা পাইতেন। আপনে যখন শুনতে চান না তাইলে থাক। ভাইজানের কাছে কি বিড়ি আছে? থাকলে একটা দেন। কেমুন ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগতাসে।
মুহিন একটা সিগারেট দিল লোকটিকে। লোকটি সিগারেট হাতে নিয়ে মোমের কাছে গিয়ে সিগারেট টা নেড়ে চেড়ে বুঝার চেষ্টা করল কোন ব্রান্ডের সিগারেট। তারপর আবার সিটে এসে বসল। তারপর সিগারেট পকেটে ঢুকিয়ে নিজের একটা বিড়ি বের করে ধরাল।
মুহিন অবাক হয়ে লোকটির কাজ দেখছে। লোকটি বলল- ভাইজান, আপনে আমারে এত দামি বিড়ি দিচেন আপনেরে আল্লাহ ভাল করব।
মুহিন হেসে বলল- ঠিক আছে। তবে আপনি সিগারেট না খেয়ে বিড়ি ধরালেন কেন?
লোকটি হেসে বলল- ভাল জিনিস ভাল টাইমে খাইতে হয়। দামি জিনিস পরে খামু।
মুহিন বলল- আপনার বিড়ির কড়া ধোঁয়া আমার সহ্য হচ্ছে না। আপনি আরেকটা সিগারেট নেন, তবুও আপনের বিড়ি ফালান। বলেই মুহিন আরেকটা সিগারেট বের করে তাকে দিল।
লোকটি হাত বাড়িয়ে আরেকটা সিগারেট নিয়ে আবার পকেটে ঢুকাল তারপর সিট ছেড়ে উঠে অন্য সিটে চলে গেল।
লোকটির আচারন দেখে মুহিন অবাক হল আবার মজাও পেল একটু।
সে আবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। একটা দিগন্ত বিস্তৃত জলাধার। চাঁদের আলো পড়ে কেমন চকচক করছে!
হটাৎ ট্রেনের গতি কমে এল। সামনে একটা ছোট গ্রামের স্টেশান। স্টেশানে ট্রেন থামল। এত রাতে গ্রামের স্টেশানে ট্রেন থামল কেন বুঝল লোকাল ট্রেনের কোন ঠিক ঠিকানা নাই। এই ট্রেনগুলো বিনা কারনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যেকোনো স্টেশানে থেমে থাকতে পারে!
মুহিন ট্রেন থেকে নামল। আরও কয়েকজনও নেমে এল ট্রেন থেকে। গ্রামের একটা সাধারন স্টেশান। স্টেশান মাস্টারের ঘরের সামনে একটা একশ ওয়াটের বাল্ব জ্বলছে। আর পুরো স্টেশান অন্ধকার। মুহিন খেয়াল করে দেখল এই নির্জন স্টেশানে একটা আন্তঃনগর ট্রেন থেমে আছে। ঐ ট্রেনের যাত্রীরা এদিক সেদিক ঘুরা ফেরা করছে।
এত রাতে এই ছোট স্টেশানে কেন একটা আন্তঃনগর ট্রেন থামল? একটু পরে জানা গেল যে সামনে কোথায় যেন রেললাইন ভেঙ্গে গেছে। সেটা সারতে অনেক সময় লাগবে। কতক্ষণ যে লাগবে কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারল না।
ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন রেল কম্পনির বাপ মা তুলে গালি দিল।
মজনু আজিজ আবার মুহিনের পাশে এসে দাঁড়াল। তারপর কোন প্রসংগ ছাড়াই বলল- ভাইজান, মানুষের মনে দুইটা দুনিয়া। এক দুনিয়ায় সব আছে, সুক, আনন্দ, আপন জন। আরেক দুনিয়ায় আচে সুধু দুক্ক, বেদনা, সৃতি। এই দুনিয়ায় মানুষটা একলা। আমি একলা দুনিয়ার ইস্থায়ি বাসিন্দা। আর আইজ আপনে হেই একলা দুনিয়ার টেম্পুরারি বাসিন্দা। ঠিক বলেছিনা ভাইজান?
মুহিন মুগ্ধ চোখে মানুষটার দিকে তাকাল। এত সুন্দর দার্শনিক কথা বার্তা লোকটা জানে কিভাবে?
আকাশের চাঁদ আবার হারিয়ে গেল মেঘের আড়ালে। টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হল।
হটাৎ মুহিনের ঘোর লেগে গেল। সেই টিপটিপ বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে হাটা শুরু করল একটা বনের দিকে।
মুহিনকে হটাৎ গভীর বনের দিকে যেতে দেখে তার পিছনে পিছনে হাটা ধরল মজনু আজিজ।
মুহিন একমনে হেঁটে যাচ্ছে। ছোট একটা জংগল। গাছের পাতা ভেদ করে বৃষ্টির পানি পড়ছে না। নিকষ কাল অন্ধকার সেখানে। তবুও মুহিন ঘোর লাগা মানুষের মত হেঁটে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে সে জানে না।
জংগলে হাজার হাজার জোনাকি জ্বলছে। মনে হচ্ছে একটা কাল চাদরে হাজার হাজার হিরে জ্বলছে। কি অদ্ভুত এক দৃশ্য!
ছোট জঙ্গলটা পেরিয়ে মুহিন দেখে একটা ছোট নদী। মুহিন সে নির্জন নদীর পাড়ে বসে গেল। পিছনে একটু দূরে স্টেশানটা ছাড়া আশেপাশে কোন বসতি নাই, কোন মানুষ নেই। খুব নির্জন এক নদীর পাড়।
বৃষ্টি আবার থেমে গেল। আবার আকাশে চাঁদ হাসি দিয়ে উঠল।
মুহিনের মনে আজ অনেক বিষণ্ণতা ভর করেছে। আসলেই কি মুহিন খুব একা একটা মানুষ? কি নেই তার? অনেক ভাল চাকরি করে, বাবা মা তাকে অনেক ভালবাসে। তবুও কিশের অভাব মুহিনের যে কারনে মাঝে মাঝে মুহিনের নিজেকে হারিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে- এই যেমন আজ করেছে মুহিন।
মুহিনের ঠিক পিছনে মজনু আজিজ এসে দাঁড়াল। তারপর মুহিনকে বলল- ভাই, আপনের মেচ বাত্তিটা দেন তো, একটা দামি বিড়ি ধরাই। আমার মেচ ভিজি গেছে।
মুহিন পকেট থেকে লাইটারটা নিয়ে নিজে একটা সিগারেট ধরিয়ে লোকটিকে লাইটারটা এগিয়ে দিল। লোকটি সিগারেট ধরিয়ে মুহিনের পাশে এসে বসল।
তারপর বলল- ভাইজান, সবার দুঃখ আছে, গরিবের দুঃখ আছে, বড়লোকের দুঃখ আছে। সে দুক্ষের মাইদ্ধে পিরিতির দুঃখ বড় দুঃখ। এই দেখেন আমি এত গরিব, ঘর বাড়ি কিচ্ছু নাই তারপরেও পিরিতির দুঃখ আছে। অনেক দুঃখ ভাই।
মুহিন উদাস গলায় বলল- আপনের আবার পিরিতের কি দুঃখ?
লোকটি বলল- এক ওষুধ বেপারি স্টেশানে হাবিজাবি ওষুধ বেচত। আমি সেই মজমায় গান গাইতাম।
মুহিন বলল- তারপর?
লোকটি বলল- আমার লগে একটা মেয়েও গান গাইত। মেয়েটারে আমি অত্তধিক ভালবাসতাম। মেয়েও আমারে ভালবাসত। কি সুখের দিন ছিল গো ভাই। আহা!
মুহিন বলল- তারপর?
লোকটি একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে বলল- তারপর আর কি? মেয়েটা দেখতে সন্দর আচিল। পরে হেই ওষুধ অলার কাছে মেয়েটা বিয়া বইচে আমারে থুইয়া। আমার কিচ্ছু নাই, আমারে মেয়ে বিয়া করব ক্যান? আমার ঘর নাই বাড়ি নাই। তারপরে আমি হেই লোকের কাম ছাইড়া দিয়া নিজেই স্টেশনে স্টেশনে গান গাই। আর বিয়া শাদি করি নাই আমি।
তারপর লোকটা খালি গলায় একটা গান ধরল-
“আশা নদীর বালুচরে বাঁধি আমি খেলা ঘর
দুচোখের দুই সরবরে-
যখন তখন ভাসেরে সেই ঘর আমার
ভাসেরে সেই ঘর। “
কি অদ্ভুত সুন্দর গলা লোকটার! গানের সুর যেন ছড়িয়ে পড়ছে এই ছোট নদীর দুই পাড়ে। মুহিন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল লোকটির দিকে। চাঁদের আলোয় দেখতে পেল লোকটির দুই গাল চকচক করছে। নিঃশব্দে কাঁদছে লোকটি।
মুহিন আবার সিগারেটে একটা লম্বা টান দিল। তারপরে সিগারেটের আগুনটার দিকে তাকিয়ে ফিরে গেল বেশ কিছুদিন পেছনে। তারও একটা মনের মানুষ ছিল। সময়ের স্রতে হারিয়ে গেছে সে। আজ সে বহু দূরে, অনেক দূরে। এত দূরে চলে গেছে সে মানুষটি যে সে চাইলেই নাগাল পাবে না তার। মুহিন একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে মানুষটির জন্য নিষ্ফল অপেক্ষায় একা একা কাটিয়ে দিয়েছে কত গুলো দিন। মুহিনের সব সময় মনে হত এই বুঝি সব ভুলের অবসান ঘটিয়ে সে ফিরে আসবে তার কাছে!
না। আর না। হটাৎ মুহিনের চেয়াল শক্ত হয়ে গেল। একটা মানুষের জন্য সে আর কত অর্থহীন অপেক্ষা করবে? যেখানে জানে যে মানুষটি তার জীবন থেকে চলে গেছে সে আর ফিরে আসবে না। সে মানুষটি মুহিনকে ভুলে অনেক সুখে আছে তবে মুহিন কেন বিরহের আগুনে প্রতিনিয়ত জ্বলছে? মুহিনের তো কোন দোষ ছিল না, তবে?
অনেক হয়েছে। আর না। মুহিন উঠে দাঁড়াল। হাত থেকে সিগারট নদীর জলে ছুঁড়ে মারল। মজনু আজিজের দিকে তাকাল মুহিন। এই পাগল কিচিমের মানুষটির সাথে মুহিন তার নিজের অনেক মিল খুঁজে পেল। মুহিনের মত এই লোকটিও তার ভালবাসার মানুষের জন্য অর্থহীন অপেক্ষা করে যাচ্ছে।
মুহিন বলল-শুন আজিজ, মানুষের জীবন একটা, ঠিক কিনা বল।
মজনু আজিজ মাথা দুলিয়ে বলল-হু ভাইজান।
মুহিন বলল- তুমি যে মেয়েটিকে ভালবাসছ সে মেয়েটি কি তোমাকে ভুলে সুখে ঘর সংসার করছে, করছে কিনা বল?
মজনু আজিজ বলল- হু।
“তাহলে তুমি কেন কষ্ট পাচ্ছ? তোমার ভালবাসার মানুষ যেখানেই থাকুক সুখে আছে- এটা কি তোমার জন্য বিশাল পাওনা নয়? আর সে মানুষটিকে যদি তুমি বিয়ে করতে তাহলে হয়ত এতটা সুখে রাখতে পারতে না। তাই না?
মজনু আজিজ কিচ্ছু বলল না, এক দৃষ্টিতে মুহিনের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হল মুহিনের কথার গুঢ় অর্থ বুঝার চেষ্টা করছে।
আকাশের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে মুহিনের দিকে চোখ ফেরাল আজিজ, বলল-ভাইজান, আমি তো কখনো এরাম করে ভাবি নাই।
‘এবার বুঝতে পারছ তো? শুন আমিও তোমার মত একটা মেয়েকে ভালবাসতাম। মেয়েটা আমাকে ফেলে চলে যায়। এখন সে হয়ত সুখেই আছে। আমি মিছে মিছি এত দিন তার অপেক্ষায় থেকে সুধু কষ্ট পেয়েছি। বলে মুহিন উঠে দাঁড়াল- হু চল, আমাদের জীবন আরও অনেক বাকি। দেখা যাক ভালবাসার জন্য আর কোন মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় কিনা!
বলে মুহিন স্টেশানের দিকে হাঁটা ধরল। পিছন ফিরে দেখল আজিজ বসে আছে। সে মনে হয় আসবে না। হয়ত সেই মেয়েটির জন্য সে আরও অপেক্ষা করবে। মুহিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
মুহিন স্টেশানে এসে দেখে ট্রেনের লোকজন এদিক সেদিক ছড়িয়ে আছে। হটাৎ ৫/৬ জনের একটা জটলার ভেতর শুনতে পেল একটা মেয়ে রাগি গলায় চিল্লাচিল্লি করছে- বলেছি তো আমাদের কোন সাহায্য লাগবে না। সুধু সুধু কেন বিরক্ত করছেন?
আরে এই গলাতো মুহিন চিনে! মুহিন লোকাল ট্রেনের পাশে দাঁড়ান আন্তঃনগর ট্রেন এবং মেয়েটির গলা শুনে যা বুঝার বুঝে নিল। নির্জন স্টেশানে কোন মেয়েকে একা পেয়ে বখাটেরা উৎপাত করছে।
মুহিন জটলার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর উঁচুগলায় বলল- “কিরে নিতু, কি হইচে? এরা কি বলতেসে?
বুদ্ধিমতি নিতু যা বুঝার বুঝে নীল। বলল-দেখ না ভাইয়া, তুমি আমাদের রেখে দোকানে গেছ, আর এই লোকগুলা আমাদের সেই থেকে বিরক্ত করছে।
মুহিন আগুন গরম চোখে লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল-কি চাই? এরা আমার বোন।
লোকগুলো একটু ইতস্তত করতে লাগলো। এমন সময় সেখানে হাজির মজনু আজিজ। “এই কি হইচে, কি হইচে?
তারপর বখাটে ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল-ঐ তোগ এহানে কি? ভাগ কইলাম। এনারে চিনস? ইনি আমার ভাই। বেশি ফাইজলামি করলে একদম ট্রেনের চাক্কার নিচে কল্লা হান্দায়া দিমু।
লোকগুলো হয়ত আজিজকে আগ থেকেই চিনত। আজিজের পরিচিত লোক দেখে আর ঝামেলা না করে একদিকে চলে গেল।
আজিজ মুহিনের দিকে ফিরে হেসে বলল-ভাইজান, আমি আপনার কথা বুঝতে পারি নাই তখন। এখন আমার মাথায় ঢুকছে। আমি আর পাগলামি করুম না। এই শিতেই শাদি করুম ইনশাল্লাহ!
মুহিন একটু হেসে নিতুদের দিকে ফিরল। বর্ষা মেয়েটা নিতুর হাত শক্ত করে ধরে আছে। ভয় পেয়েছে মেয়েটা অসম্ভব বুঝা গেল। বর্ষার মাথাটা থেকে থেকে দুলছে। মনে হচ্ছে এখনি ঘুরে পড়ে যাবে। সাহসি মেয়ে নিতু ভয় পেলেও হাবভাবে বুঝা যাচ্ছে না।
নিতু বলল- মাই গড! ভাইয়া ভাবতেও পারিনাই এই স্টেশানে এই বিপদে আপনার সাথে আবার দেখা হয়ে যাবে! জীবনে ফেরেস্তা দেখলেও এত খুশি হতাম না আজ আপনাকে দেখে যতটা খুশি হয়েছি আমি!
তারপর কিভাবে মুহিন এ স্টেশানে আসল সব খুলে বলল মুহিন। আজিজের সাথে কিভাবে পরিচয়।
সব শুনে নিতু বলল- ভাইয়া কেন এত পাগলামি করেন বলেন তো? আমাদের জীবন কি এতই ছোট যে একটা মানুষের জন্য সব থেমে যাবে?
মুহিন বলল-হু, পাগলামি ছেড়ে দিব ভাবছি। অনেক তো হল আর কত!
এমন সময় আজিজ খবর নিয়ে এল আজ সারারাতেও লাইন ঠিক হবে না। এখান থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে একটা বাস স্ট্যান্ড আছে ওখানে যেতে হবে হেঁটে। এত রাতে এখানে কোন রিক্সা পাওয়া যাবে না।
সবাই ঠিক করল যে সারারাত বসে না থেকে বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে চেষ্টা করাই ভাল।
গ্রামের কাঁচা রাস্তা। তিন ব্যাটারির টর্চ আর নিতু বর্ষার ব্যাগ কাধে নিয়ে আগে আগে হাঁটছে আজিজ, পেছনে মুহিন তার এক পাশে নিতু আর অন্য পাশে বর্ষা। নিতু মেয়েটা মুহিনের হাত ধরে আছে আর বর্ষা একটু দূরে দূরে হাঁটছে। এই রাতের বিপদ কিছু অপরিচিত মানুষকে বেঁধে দিয়েছে জন্মান্তরের বাঁধনে। এ বাঁধন, এ বিশ্বাস সহজে ছিঁড়ে যাবার মত নয়। মুহিন ঠিক করেছে আজিজ লোকটাকে তার বাড়িতে একটা কাজ দিয়ে দিবে। ছুটিতে দেশে আসলে প্রতি সন্ধায় আজিজের মধুর গলার গান শুনবে সে। এবার আর নিশ্চয়ই বিরহের গান গাইবে না আজিজ!
নিতু মেয়েটা কি মনে করে মুহিনের হাত ছেড়ে সামনে আজিজের পাশে চলে গেল। আজিজের সাথে কি সব গল্প শুরু করে দিল। বেচারা আজিজ! নিতুর পাল্লায় যখন পড়েছে তখন বুঝবে তার চেয়েও বড় পাগল এই দুনিয়ায় আছে!
দূরে কোথাও শেয়াল ডেকে গেল। ভয়ে বর্ষা হটাৎ মুহিনের গা ঘেঁষে দাঁড়ালো।
মুহিন বলল- কি ভয় লাগছে? ভয়ের কিচ্ছু নেই বোকা মেয়ে। আমি আছি না!
বর্ষা বলল-তবুও আমার ভয় লাগছে। আমি আপনার হাতটা ধরি?
মুহিন উদাস গলায় বলল- অনেক বছর আগে একজন মানুষ অনেক ভালবাসা নিয়ে আমার হাত ধরেছিল। আজ সে অনেক দূরে।
বর্ষা অভিমানি গলায় বলল-যে চলে গেছে থাক না তার কথা। আমরা দুজন মিলে দোয়া করি উনি যেন সুখে থাকেন।
একথা বলে দুজনই চুপ। যেন এক মহাকালের নিস্তব্ধতা ভর করেছে দুজনের মাঝে।
কি যেন ভেবে বর্ষা বলে উঠল- আমি জানি আমি খুব বোকা একটা মেয়ে। আমি কখনো একা সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। নিতুই আমাকে সবসময় সব বিষয়ে সাহায্য করে। আজ আমি একা একটা সিদ্ধান্ত নিতে চাই। আমি আপনার হাতটা ধরতে চাই সারা জীবনের জন্য। আমার মত বোকা একটা মেয়ে আপনাকে সুখি করতে পারবে কিনা জানি না তবে এতটুকু কথা দিতে পারি আমি এত হাত কখনো ছাড়ব না।
মুহিন কিছু বলল না। বর্ষার মায়াবি মুখের দিকে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। তার মনে হল-এই মায়া ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে ভুলে থাকা যায় অসীম দুঃখমালা, কাজল কাল চোখের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাওয়া যায় গভীর রাতের মাঝ সমুদ্রের কাল নোনা জল।
মুহিন কিছু না বলে তার ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল। বর্ষা সেটা দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে একমনে হাটতে লাগলো।
পরিশেষ-
বর্ষার ভয়ের কারনে মাথার দুলুনি একেবারে কমে গেছে। তার পাশে এখন মুহিন আছে, আছে মুহিনের ভালোবাসা। সেজন্য ভবিষ্যতে বর্ষার এ রোগ সেরে যাবে বলে আশা করা যেতে পারে।
নিতু মজনু আজিজকে খালি খেপাচ্ছে। আজিজ এই পাগলি মেয়ের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। আজিজ মনে মনে বলল-হে খোদা! এই পাগলা মেয়ের হাত থিকা আমারে উদ্ধার কর!
নিতু একবার পিছনে ফিরে দেখল মুহিনের হাত ধরে তার প্রান প্রিয় বান্ধবি হেঁটে আসছে। অনেক ভাল লাগায় বুক ভরে গেল নিতুর। যাক, বোকা মেয়েটা তাহলে নিজে নিজে একটা ভাল সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে!
নিতু খুশি মনে আবার পথ চলতে লাগলো।