দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে কাল বিভাজন

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে প্রাগৈতিহাসিক যুগ (Prehistory Age In the History of South Asia) : প্রাচীন পাথরের হাতিয়ারের ভিত্তিতে মানুষের সংস্কৃতিকে বুঝার জন্য গ্রিকগণ এ নামটি (Palaeolithic) ব্যবহার করেছেন। তবে পণ্ডিতগণ প্রাগৈতিহাসিক মানুষের ব্যবহৃত পাথরের যন্ত্রপাতি এবং নব্য প্রস্তরযুগের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির আলােকে প্রাচীন দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ইতিহাস পুনর্গঠন করেছেন। পণ্ডিতগণ মনে করেন যে, পাঁচ লক্ষ বছর আগে দক্ষিণ এশিয়ার মাটিতে মানুষ বসবাস করতাে। অনেক পণ্ডিতের ধারণা এই যে, দ্বিতীয় বরক যুগ হতে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ বসতি আরম্ভ করে। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রমাণাদি বিবেচনা করে প্রত্নতাত্ত্বিকরা সিদ্ধান্তে পৌছেন যে, চার থেকে দুই লক্ষ বছর আগে এশিয়ায় জনবসতি ছিল। মানুষের বসবাস এবং তাদের ব্যবহৃত হাতিয়ার এবং জীবনযাত্রাকে ভিত্তি করে প্রাগৈতিহাসিক কাল চারটি অংশে ভাগ করা হয়েছে ।

যথা :
১. প্রাচীন প্রস্তরযুগ;
২. মধ্য প্রস্তরযুগ;
৩. নব্য প্রস্তরযুগ ও
৪. ধাতুর যুগ।

১. প্রাচীন প্রস্তরযুগ (Palaeolithic age) : প্রাগৈতিহাসিক কালে মানুষের ব্যবহৃত সবরকম হাতিয়ার ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র ছিল অমসৃণ পাথরের তৈরি। এ প্রাচীন প্রস্তরযুগের সঠিক কাল বিষয়ে সর্বজনস্বীকৃত মত তৈরি হয় নি। অধিকাংশ পণ্ডিত মনে করেন যে, খ্রিস্টপূর্ব ৪,০০,০০০ লক্ষ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২,০০,০০০ অব্দের মধ্যবর্তী সময় কালকে প্রাচীন প্রস্তরযুগের সময় কাল নির্ধারণ করেছেন। এ যুগের মানুষের ব্যবহার করা দ্রব্যের নিদর্শনাদি পাকিস্তানের অন্তর্গত পাঞ্জাবের সােয়াননদীর অববাহিকায়, মাদ্রাজের নীলগিরি অঞ্চলে পাওয়া গেছে। এ হাতিয়ারগুলো কোয়ার্টজ পাথর দ্বারা তৈরি হতাে বলে এ সংস্কৃতিকে কোয়ার্টজ সংস্কৃতি এবং এ হাতিয়ার ব্যবহারকারী মানুষকে কোয়ার্টজন মানব (Quartzan man) বলা হতাে।

প্রাচীন পাথর যুগের মানুষ জীবনধারণের জন্য প্রয়ােজনে শিকার ও গাছের পযােণী লতাগুলু সংগ্রহ করতো। অর্থাথ এ যুগ ছিল খাদ্য সহকারীদের যুগ । বন্য পশু শিকার এ যুগের প্রধান অর্থনীতি ছিল । মানুষ বেঁচে থাকার প্রয়ােজনে সংঘবদ্ধ হয়ে বাস করতো। ফলে এ সময়ে গােষ্ঠীবদ্ধ জীবনযাপনের উদ্ভব হয়। অনেক পণ্ডিত মনে কবেন যে, প্রাচীন প্রস্তরযুগে মানুষ জঙ্গলে, নদী ও হ্রদের তীরে বাস করতো। প্রাচীন পাগবেনা যুগে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ আগুনের ব্যবহার জানতাে। পাথরের যুগে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ আগুনের ব্যবহার জানতাে। তারা শিকারকে আকৃষ্ট করার জন্য গুহাতে প্রাণীর চিত্র একে জাদু অনুষ্ঠান করতাে। এ সময়ে কোন কবর পাওয়া যায় নি।সম্ভবত মৃত দেহকে হাঁটু ঘুরে বসিয়ে কবর দিতাে। প্রাচীন প্রস্তরযুগের লােকেরা ছিল নিগ্রোটো জনগােষ্ঠীর পূর্বপুরুষ। ভারতের আন্দামানে তাদের বংশধরেরা এখনাে বসবাস করে বলে মনে করা হয়। এরা ছিল খর্বাকৃতির কৃষ্ণকায় চেপ্টা নাক বিশিষ্ট এবং এদের মাথার চুল ছিল কোকড়ানাে।

Read More >>  অধ্যবসায় রচনা

২, মধ্য প্রস্তরযুগ (Mesolithic age) : প্রাচীন ও নব্য প্রস্তরযুগের অন্তর্বর্তীকালীন যুগকে মধ্য প্রস্তরযুগ বলা হয়। তবে এ দুই যুগের মধ্যে কোন সীমাৱেখা দেখানাে অনেকটা কঠিন। অধিকাংশ পণ্ডিত মনে করেন যে, খ্রিস্টপূর্ব ২,০০,০০০ অব্দ ও খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০ অব্দের মাঝামাঝি সময় সম্ভবত মধ্য প্রস্তরযুগ চলছিল। এ সময় মানুষ তার পারিপার্শ্বিক বাধাবিপত্তি দূর করার দিকে মন দেয়। এ যুগে পাথরের তৈরি হাতিয়ার ও অন্যান্য সাহায্যের নিদর্শন দক্ষিণে তিনেডাল, গুজরাট, সবরমতি,  েম্বাইয়ের উপকূল অঞ্চলে, গােদাবরি ও নর্মদা উপত্যকায় এবং মহিশুরের নীলগিরি অঞ্চলে পাওয়া গেছে। এ যুগের মানুষের প্রধান হাতিয়ার ছিল পাথরের ফলা ও ছোট ছােট পাথরের নুড়ি যা তীরের অগ্রভাগে ব্যবহার করা হতো। এ যুগে মাটির তৈরি পাত্রের ব্যবহার শুরু হয়। তবে কুকারের চাকা তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নি। অনেক পণ্ডিত মনে করেন যে, কুকারের চাকার আবির্ভাব ঘটে নব্য প্রস্তরযুগের শেষের দিকে কিংবা নব্য প্রস্তর সূচনায়। এ যুগেই জীবজন্তুকে পােষ মানানাের চেষ্টা শুরু হয়। পশু শিকার, মৃৎশিল্পের অগ্রগতি, চাষাবাদের প্রাথমিক চেষ্টা ইত্যাদি এ যুগের বৈশিষ্ট্য ছিল। মধ্য প্রস্তরযুগের মানুষ সিলেকেট ও সিলসিংগেনি পাথর দিয়ে হাতিয়ার তৈরি করতাে। এ যুগের মানুষ পশু শিকার, মৎস্য শিকাৱ এবং ফলমূল আহার করে জীবনধারণ করতাে। পশুর হাড় এবং পাথর দিয়ে বড়শি তৈরি করে মাছ ধরতাে। এ যুগের পাথরের অস্ত্র ও হাতিয়ার ছিল অতি ক্ষুদ্র এজন্য এগুলােকে ক্ষুদ্র পাথর বা (Microliths) বলা হয় ।

Read More >>  পদ্মা সেতু রচনা

৩. নব প্রস্তরযুগ (Neolethic age) : মানুষের অগ্রগতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ যুগের নাম ছিল নবপলীয় বা নব্য প্রস্তরযুগ। মধ্য প্রস্তরযুগের পরবর্তী উন্নত সভ্যতা। হলাে নব্য প্রস্তরযুগের সভ্যতা। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-৫০০০ অব্দে নব্যপ্রস্তর যুগ। এ যুগ। নব্য প্রস্তরযুগ বলা হয় এ কারণে যে, এ যুগেও মানুষকে একান্তভাবে পাথরের সরঞ্জাম। ও উপকরণের উপর নির্ভর করতে হতাে। অনেক পণ্ডিত মনে করেন যে, এ যুগে মনুিষ। স্বর্ণ ও তামার ধাতুর সন্ধান পেয়েছিল। তবুও এ সময় মানুষ ইচ্ছামতাে বিভিন্ন পাথর দিয়ে উন্নতমানের মসৃণ ও সূক্ষ্ম জিনিসপত্র তৈরি করতে পারতাে। নব্য প্রস্তরযুগের সভ্যতা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বত্র কম বেশি পাওয়া গেলেও আর্যাবর্তে এর নিদর্শন সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে সিন্ধু দেশ এবং বেলুচিস্তানে। এছাড়াও পূর্ব ভারতে বিহার, উড়িষ্যা, মালাবার, বেলারী জেলা, গুজরাটের কাথিয়াবাঢ় প্রভৃতি স্থানে নব্য প্রস্তরযুগের সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গেছে। নব্য প্রস্তরযুগে জীবিকা হিসেবে কৃষি ও পশুপালনকে গ্রহণ করেছিল। মানুষ যাযাবর জীবনের সাথে শক্ত পাথর দিয়ে গৃহ তৈরির কৌশল আবিষ্কার করে। বৃষ্টি ও সূর্যের প্রখর তাপের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ঘর তৈরির কৌশল গ্রহণ করেছিল এ যুগে। শস্য উৎপাদন, পশুপালন, ঘরবাড়ি নির্মাণ, আগুনের ব্যবহার, কুম্ভকারের চাকার আবিষ্কার, বস্ত্র বুনন, নৌকা তৈরি প্রভৃতি ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয় । নবপলীয় যুগে মানুষ মৃতদেহকে কবর দেয়া শিখেছিল। নতুন প্রস্তরযুগের কয়েকটি সমাধি পাওয়া গেছে। এ থেকে জানা যায় যে, সে সময় মৃতদেহ মাটির বৃহদাকার পাত্রে রেখে কবরস্থ করা হতাে। কোন কোন সমাধির উপর পাথরের আচ্ছাদন দেয়া হতাে। পাথরের খুঁটির উপর এ আচ্ছাদন থাকতাে।

Read More >>  সময়ের মূল্য রচনা

নবপলীয় যুগে কৃষি, পশুপালন, সমাজ সংগঠন প্রভৃতির ক্ষেত্রে উন্নতির ফলে মানুষের জীবনযাত্রার অগ্রগতির ক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয় তা পরবর্তী সময়ে সভ্যতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নবপলীয় যুগে মানুষের এ অগ্রগতিতে নবপলীয় বিপ্লব হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার সিন্ধুসভ্যতা এ নবপলীয় বিপ্লবের নিদর্শন।

৪. ধাতুর যুগ (Age of metals) : নবােপলীয় যুগের পরে মানুষের অগ্রগতির যুগকে ধাতুর যুগ বলা হয়। এ যুগে তামা, ব্রোঞ্জ এবং পরে লােহার যন্ত্রপাতি ব্যবহার শুরু হয়েছিল। তবে এ যুগেও পাথরের কিছু কিছু হাতিয়ার ও সরঞ্জামের ব্যবহার ছিল । এজন্য অনেকেই একে তাম্র প্রস্তরযুগ বলে অভিহিত করেন। এ যুগে কৃষি পশুপালন ও মৃৎশিল্পে কুম্ভকারের চাকার ব্যবহার ব্যাপকভাবে শুরু হয়।

এ যুগে তামা ও টিনের মিশ্রণে ব্রোঞ্জের জিনিসপত্র তৈরি হতে থাকে। এজন্য অনেকে এ যুগকে ব্রোঞ্জ যুগ বলে অভিহিত করেছেন। ব্রোঞ্জের পরে লােহার আবিষ্কার হয়। লােহার ব্যাপক ব্যবহার অর্থনীতি ও রাজনীতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়।

এজন্য লােহার আবিষ্কার ও তৎপরবর্তী যুগকে লৌহ যুগ বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। দক্ষিণ এশিয়ার আর্যদের আগমনের শুরু থেকেই লৌহ যুগ শুরু হয়। আর্যরা ভারতে লােহার প্রচলন করেছিল ।

Leave a Comment