বাংলার ইতিহাসে কাল বিভাজন

বাংলার ইতিহাস পুনর্গঠন বা আলােচনা প্রসঙ্গে সময় এবং সময়ের বিভাজনটিকে বিবেচনায় আনতে হয়। কাল বিভাজনের ইউরােপীয় স্টাইল বর্তমান বাংলার ইতিহাসের ক্ষেত্রেও প্রয়ােগ করা হয়। বাংলায় প্রথম মানুষের বসতি স্থাপন এবং তারপর বিশাল পথ পরিক্রমার মাধ্যমে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিবর্তিত অবস্থাকে তিনটি কালে ভাগ করা যায়। যথা :

১. প্রাগৈতিহাসিক কাল
২. ঐতিহাসিক কাল ও
৩. আধুনিক কাল।

প্রাগৈতিহাসিক কাল (Prehistorical period):

প্রাগৈতিহাসিক কালকে পুরােপলীয় ও নবােপলীয় এ দুভাগে ভাগ করা যায় । পৃথিবীতে মানুষের বসবাসের ইতিহাস ২৫ লক্ষ বছর পুরােনাে।” সর্বপ্রথম কোন সময় বাংলার মানুষের বসতি আরম্ভ হয় তা জানার কোন উপায় নেই। তবে বাংলার আদিম মানব সভ্যতার বিবর্তন হয়েছিল। এখানে প্রত্ন ও নব্য প্রস্তর এবং তাম্রযুগের অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া গেছে। পুরােপলীয় যুগে মানুষের ব্যবহৃত আয়ুধ (Cleavers) হাত কুঠার (Handaxes), মাংস কাটরা (Choppers) যন্ত্র পাওয়া গেছে। মেদিনীপুর জেলার অরগণ্ডা, সিলদা, অষ্টজুরি, শহর ভগবন্ধু জাগর গ্রাম, কুকরাদুলি, গিড়ানা ও চিলকীগড়; বাকুরা জেলার কাল্লা ওলান বাজার, মনােহর, বন অসরিয়া, শহর জোড়া, কাকড়াদারা, বাউরিডাঙ্গা, শশুনিয়া ও শিলাবদী নদীর প্রশাখা জয় গন্ডা নদীর অববাহিকা; বর্ধমান জেলার গােপালপুর, সাত আনিয়া, বিলগ, সাগরডাঙ্গা আরও খুরপীর জঙ্গল ও কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ে পুরােপলীয় যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০ অব্দে। খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০ হাজার অব্দ থেকে তাম্রযুগ পর্যন্ত খ্রিস্টপূর্ব ২,০০০ হাজার অব্দ পর্যন্ত।

নবপলীয় যুগে বাংলার পশুপালন এবং পরে কৃষি ও বয়ন এর উদ্ভব হয়। নব্য প্রস্তরযুগ পর্যন্ত মানুষ আয়ুধ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি প্রস্তর দ্বারা নির্মাণ করতাে। পরে। তামার ব্যবহার শুরু হয়। এ যুগে বাংলার তাম্রযুগীয় সভ্যতা শুরু হয়। এ পর্যায়ে বাংলার নগরায়ণ শুরু হয়। বাংলায় এ রূপ নগর সভ্যতার নিদর্শন হচ্ছে পাণ্ডুরাজার ঢিবি এবং ওয়ারী বটেশ্বর। পাণ্ডুরাজার ঢিবি বর্ধমান জেলার আউস গ্রাম থানায় অবস্থিত। ১৯৬২-১৯৬৫ সালে খনন করে অজয়, কুন্নর ও কোপাই নদীর উপত্যকায়। নবপলীয় সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গেছে। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ হাজার বছর পূর্ব থেকেই এখানে মানুষ নবপলীয় সংস্কৃতির অধিকারী হয়। এ সভ্যতার লােকেরা সুপরিকল্পিত নগর ও রাস্তাঘাট তৈরি করতাে। তারা গৃহ ও দুর্গ এ উভয়ই নির্মাণ করতাে। তামার যন্ত্রপাতি আসবাবপত্র প্রভৃতির নিদর্শন থেকে তাদের উন্নত জীবনযাত্রার পরিচয় মিলে। কৃষি ও বাণিজ্য তাদের অর্থনীতির প্রধান বৃত্তি ছিল। বিদেশের সাথে তারা ব্যবসায় বাণিজ্য করতাে। এ সভ্যতার লােকেরা ধান ও অন্যান্য শস্যের উৎপাদন করতাে এবং পশুপালন ও কুম্ভকারের কাজ জানতাে। পূর্ব-পশ্চিম দিকে শয়ন করে তারা মৃতব্যক্তিকে সমাধিস্থ করতাে। এ অঞ্চলে মাতৃকা দেবীর পূজা প্রচলিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের দিকে আর্যরা সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস করে ভারতে প্রবেশ করে। আর্যরা ভারতে লাের প্রচলন করে। এ সময় বাংলায় অস্ট্রিক জাতি বসবাস করতাে। বৈদিক যুগের শেষ ভাগে বাংলায় আর্য প্রভাব বৃদ্ধি পায়। গ্রিক বিবরণ থেকে জানা যায় যে, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ অব্দে বাংলায় গঙ্গারিডই জাতি বাস করতাে। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের পর বাংলার মৌর্য শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পরবর্তী বাংলার ইতিহাস অন্ধকারাচ্ছন্ন । যদিও বাংলায় কুষাণ ও শুP আমলের মুদ্রা পাওয়া গেছে তবে ধারাবাহিক ইতিহাস রচনার তথ্যসংগ্রহ বেশ কঠিন। তবে আমলের দালিপি ও সাহিত্যিক উপাদান প্রাপ্ত হওয়াতে এ সময়ের ইতিহাস আমাদের কাছে স্পষ্ট। এ দিক থেকে বিবেচনা করলে গুপ্ত শাসনকে নবপলীয় যুগের শেষ পর্যায় এবং ঐতিহাসিক কালের সূচনা পর্ব ধরা যেতে পারে ।

Read More >>  ছাত্রজীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য রচনা

বাংলার ইতিহাস ঐতিহাসিক যুগ বা প্রাচীন কাল:
(Ancient Period of the History of Bengal)

বাংলায় গুপ্ত শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযােগ্য পরিবর্তন আসে। বাংলা গুপ্ত শাসনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এখানে ধ্রুপদী সংস্কৃত সাহিত্য, শাসন, নাগরিক জীবনবােধ এবং সুগঠিত শাসন পদ্ধতি গড়ে উঠে। গুপ্ত শাসন উদার হওয়ায় বৌদ্ধ সংস্কৃতিও বিকশিত পর্যায় ছিল। ব্যবসা বাণিজ্যের বিকাশ হওয়ায় জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। গুপ্ত শাসনের বিলুপ্তির পরবর্তী পর্যায় রাজা শশাঙ্ক বাংলার গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সম্ভবত এ পর্যায়ে বাংলার জনপদগুলাে তাদের সত্তা হারিয়ে গৌড়ে রাজ্য বিলীন হয়। এরপর বঙ্গ জনপদে বাকি জনপদগুলাে বিলীন হয়। এ সময় বাংলার বৌদ্ধ ও জৈন এ দুটি সংস্কৃতির ধারা প্রবাহমান ছিল। পাল আমলে বৌদ্ধরা শক্তি অর্জন করে। পালদের সাথে হিন্দু সংস্কৃতির সংঘাত জোরালাে হয়। এ পর্যায়ে বাংলার সামন্ত সমাজ ও রাষ্ট্রের অবক্ষয় দেখা দেয়। এ পর্যায়ে বাণিজ্য পুঁজিতে উদীয়মান মুসলিম রাজশক্তি তুর্কিদের নেতৃত্বে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলার হিন্দু সংস্কৃতির উপর আঘাত হানে। বৌদ্ধরা আগত মুসলিম শক্তিকে অভ্যর্থনা জানায়। বাংলায় ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের সাথে সাথে প্রাচীন যুগের অবসান ঘটে। ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে তুর্কিরা পূর্ব রােমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনােপল দখলের সাথে সাথে যেমন মধ্যযুগের অবসান ঘটে ঠিক তেমনি ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি সেনাপতি বখতিয়ার খলজি বাংলার অস্থায়ী রাজধানী লক্ষ্মণাবতী দখলের সাথে সাথে বাংলার ইতিহাসের প্রাচীন যুগের অবসান ঘটে।

Read More >>  রচনা ৭ মার্চের ভাষণ

কাল বিভাজনের প্রয়ােজনীয়তা (Importance of Periodisation):

কাল নদীর প্রবাহ ধারার ন্যায় অবিভাজ্য ও অখণ্ডিত। কিন্তু ইতিহাসে ঘটনা। প্রবাহের ধারায় পৌরাপর্বের অর্থাৎ ঘটনার পূর্বা ও পর বুঝার জন্য কালকে বিভাজন করা হয়। কাল বিভাজন বা পর্ব বিভাগের একটি ব্যবহারিক যুক্তিও আছে। যে ইতিহাসের কালসীমা খুব সংক্ষিপ্ত দু’চার দশ বছর মাত্র সে ক্ষেত্রে পূর্ব বিভাগের (কাল বিভাজনের) ব্যাপারটা সাধারণ জটিল কিছু নয়। কিন্তু কালসীমা যে ক্ষেত্রে দীর্ঘব্যাপ্ত কালকে হাতের মধ্যে ধরে সেই কালের বিচিত্র ও অগণিত তথ্য ও ঘটনাবলির বর্ণনা, বিশ্লেষণ ও বিচার, যুক্তি শৃঙ্খলা সেগুলাে সাজানাের মধ্যেই ঐতিহাসিকদের দক্ষতা এবং ইতিহাসের মূল্য নির্ভর করে। এ পর্ব বিভাগের সাহায্যেই ইতিহাস পুনর্গঠন যুক্তিযুক্ত হয়।

Leave a Comment