অধ্যবসায় রচনা

অধ্যবসায় রচনা

ভূমিকা: এ পৃথিবীতে কোনো কাজই একেবারে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয় না। জীবনে চলার পথে প্রতি মুহূর্তেই নানা বাধা-বিপত্তির উদ্ভব হয়। তাই কোনো কাজই একেবারে ঝামেলামুক্ত ভাবে শেষ হয় না। অনেকক্ষেত্রে বারবার ব্যর্থতা বরণ করতে হয়। কিন্তু একজন শ্রেষ্ঠ কর্মী কোনোদিন ব্যর্থতাকে ভয় পায় না। কোনো ক্ষেত্রে বারবার বিফলতা বরণ করা সত্ত্বেও অদম্য উৎসাহ ও দৃঢ়তা নিয়ে কাজটি সম্পন্ন করার জন্য এগিয়ে যাওয়ার বৈশিষ্ট্যেরই নাম অধ্যবসায়। মানব জীবনের যেসব গুণ জীবনকে সুন্দর ও সার্থক করে গড়ে তুলতে পারে তার মধ্যে অধ্যবসায় হল অন্যতম। জীবনে সফলতা লাভের প্রথম সোপান এ অধ্যবসায়। পৃথিবীতে সফলকাম, বিখ্যাত ব্যক্তিমাত্রই ছিলেন অধ্যবসায়ী। এ সংসারে প্রতিভা বলে একটা জিনিসের কথা শোনা যায়। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তিরা বলেন, প্রতিভার পনেরো আনাই হল অক্লান্তভাবে কাজ করে যাওয়ার মনোভাব ও শক্তি। প্রকৃতপক্ষে মননশীল দৃঢ়তাই নাম অধ্যবসায়। একজন শ্রেষ্ঠ কর্মী কোনোদিন কর্মকে ভয় পান না বলেই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন-

কোন কাজ ধরে যদি উত্তম সেজন/হউক সহস্র বিঘ্ন ছাড়ে না কখন।

অধ্যবসায় সাফল্যের চাবিকাঠি: পরিশ্রম, উদ্যম, অভিনিবেশ, মানসিক শক্তি ও সাফল্যের দৃঢ়তা এসব হল অধ্যবসায়ের অঙ্গ। জীবনের পথে এগোতে হলে মানুষকে এসব গুণাবলির অধিকারী হতে হয়। সমাজে নানা বাধাবিঘ্ন আছে। কর্মের পথেও নানা বাধাবিপত্তির উদ্ভব হয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও যিনি সকল বাধাবিপত্তিকে তুচ্ছ করে অদম্য প্রাণবন্ততায় অধ্যবসায়ের সাথে অগ্রসর হন, তিনিই হন কৃতকার্য, বিজয়ীর জয়মাল্যে ভূষিত। এ পৃথিবীতে যাঁরা সফলতা লাভের জন্য সামনের দিকে এগিয়ে চলেন, কখনো পেছনে ফিরে তাকান না তারাই এ পৃথিবীর বড় বড় ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন। যাঁরা সফলতা লাভ করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকইে ছিলেন অধ্যবসায়ী। তাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন-

Read More >>  ডিজিটাল বাংলাদেশ রচনা

ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো, আগুন জ্বালো, আগুন জ্বালো।

ব্যর্থতাকেই সাফল্যের মূল স্তম্ভরূপে গড়ে তুলতে হবে। বারংবার আঘাতে পাথরও যেমন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়, তেমনি অধ্যবসায়ীর অদম্য প্রচেষ্টার মুখে সব প্রতিবন্ধকতা নিমিষে ধূলিসাৎ হয়ে যায়, কেটে যায় সব অমানিশার কালো মেঘ।

অধ্যবসায় ও মানবজীবন: এ সংসারে সকল মানুষের কর্মদক্ষতা সমান নয়। কাজের উদ্যম, আগ্রহ, সাফল্যের দৃঢ়তা, মনোভাব, শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী বিচার করলে মানুষকে তিন ভাগে ভাগ করা যায় – অধম, মধ্যম ও উত্তম।

কাজের কথা শুনলেই যাদের হৃদকম্প উপস্থিত হয়, যারা কাজকে এড়িয়ে চলতেই ভালোবাসে ও তাতেই তাদের পরম সুখ, যারা নিতান্তই পরমুখাপেক্ষী তারাই অধম পদবাচ্য মানুষ। এ জগতের কোনো কল্যাণই তাদের দ্বারা সংঘটিত হয় না। এরা নিজেদের দ্বারা অন্যের বোঝা বাড়ানোতেই  অধিক পারদর্শী।

আরেক ধরনের মানুষ আছে যারা অত্যন্ত উৎসাহভরে ও উদ্দীপনা সহকারে কোনো কাজ আরম্ভ করে বটে, তবে তা শেষ করার জন্য মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। এরা কাজটি সমাপ্ত করার লক্ষ্যে মনে সাহস সঞ্চার করে উঠতে পারে না। কর্মের পথে কোনো বাঁধা উপস্থিত হলেই তারা তাতে ক্ষান্ত দিয়ে মনে করে-অনেক করেছি, আর কেন? এরাই মধ্যম পদবাচ্য মানুষ। জগতের কোনো কল্যাণ সম্পদ এদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় না, পৃথিবী এদের কাছে বড় কিছু আশা করতে পারে না। জীবনের উন্নতির পথে অধ্যবসায় অতীব গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ সেই প্রাচীনকাল থেকেই সংগ্রাম করে আসছে এই পৃথিবীর বুকে টিকে থাকার জন্য। মানুষ সংগ্রাম করেই এ পৃথিবীতে তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছে। ঘূর্ণিবাত্যা, ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, আকাশের বজ্র বিদ্যুৎ সবকিছুর বিরুদ্ধেই লড়াই করতে হয়েছে মানুষকে। আজকে মানুষ যে পর্যায়ে  উপনীত হয়েছে তার পিছনে কাজ করছে অনন্ত অধ্যবসায়। মানুষ একদিনে এই সাফল্যের মুখ দেখে নি, বহুদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম তাকে এ পর্যায়ে টেনে এনেছে, দিয়েছে মানুষ হয়ে মানুষের মতো করে বেঁচে থাকার স্বীকৃতি। তাকে আত্মমর্যাদায় ভূষিত করেছে এবং এর পিছনে কাজ করেছে মানুষেরই অধ্যবসায়ের চরম নিদর্শন। আজ হিংস্র শ্বাপদও তাকে দেখলে দূরে পলায়ন করে। কেবলমাত্র অধ্যবসায়ের বলেই মানুষ এ বিজয় অর্জনে সমর্থ হয়েছে।

Read More >>  বিদ্যা অমূল্য ধন ভাবসম্প্রসারণ

অধ্যবসায়ের প্রাপ্তি: বর্তমানে পৃথিবীর বুকে যত কিছু আমরা ভোগ করছি, আনন্দে উল্লসিত হচ্ছি যতো কিছু দেখে, যা আমাদের মুগ্ধ করে, করে অভিভূত-সবই মানুষের অনন্ত অধ্যবসায়েরই ফল। মানুষ যদি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্রিয় না হতো তাহলে শ্রেষ্ঠ জীবের মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার সৌভাগ্যটুকুও আমাদের হতো না, পড়ে থাকতাম অনেক নিচে। বস্তুত, মানুষের কৃতকর্মের ওপর দাঁড়িয়েই আমরা এ পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখার, নতুনভাবে জানার সুযোগ লাভ করেছি। এ পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে তাই এগোতে হবে অধ্যবসায়ের পথে। কারণ, অধ্যবসায় ব্যতীত কিছু হয় নি, কিছু হবেও না। এ পৃথিবীতে কেউ কারো জন্য সুখের উপকরণ সাজিয়ে রাখে না, নিজের সুখের জন্য নিজেকেই সকল কিছু অর্জন করতে হয়। আর একমাত্র অধ্যবসায় জীবনের চলার পথকে করে তুলতে পারে আরো সুগম, অধিকতর মসৃণ।

মহাপুরুষদের অধ্যবসায়ের দৃষ্টান্ত: বিশ্বের ধর্ম প্রবর্তক, জ্ঞানী, মহাপুরুষ, সাধু, রাজনীতিবিদ, সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক, শিল্পী, সাহিত্যিক-সকলেই অন্তহীন অধ্যবসায়ের দ্বারা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। অত্যন্ত ক্ষুদ্র অবস্থা থেকে উপনীত হয়েছেন সাফল্যের দরজায়। বিশ্ববিশ্রুত বৈজ্ঞানিক স্যার আইজ্যাক নিউটন বহু পরিশ্রম করে একটি বই লেখেন কিন্তু  তাঁর পোষা কুকুর মোমবাতি উল্টে দিয়ে সেই মূল্যবান বইটি পুড়িয়ে ফেলে। কিন্তু তিনি বিন্দুমাত্র দমে না গিয়ে পুনরায় সে বইটি রচনা করেন। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবর প্রথম জীবনে পিতৃরাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে অসহায় জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। কিন্তু তিনি অদম্য অধ্যবসায়ের বলে আফগানিস্তানের সম্রাট ও সমগ্র ভারতবর্ষের অধীশ্বর হয়েছিলেন। সম্রাট বাবরের পিতা তৈমুর ছিলেন অধ্যবসায়ের মূর্ত প্রতীক। প্রবল অধ্যবসায়ের দ্বারাই তিনি নিজের আয়ত্তে আনেন এশিয়া ও ইউরোপের একাংশ। স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট ব্রুস, ইংল্যান্ডের রাজা এডওয়ার্ডের সাথে ছয়বার যুদ্ধে পরাজিত হন ও পরে এক সামান্য মাকড়সার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সপ্তমবারের মতো যুদ্ধে লিপ্ত হন ও হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। অর্ধ পৃথিবীর অধীশ্বর নেপোলিয়ান ছিলেন অধ্যবসায়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কোনো কিছুকেই তিনি অসম্ভব বলে মনে করতেন না।

Read More >>  সময়ের মূল্য রচনা

উপসংহার: বস্তুত অধ্যবসায় ব্যতীত পৃথিবীতে পূর্বেও যেমন কোনো কর্ম সাধিত হয় নি, ভবিষ্যতেও হবে না। কেবলমাত্র অধ্যবসায়ই এনে দিতে পারে এ পৃথিবীতে টিকে থাকার নিশ্চয়তা, মানুষ হয়ে মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকার। অধ্যবসায় বলেই মানুষ স্মৃতিশক্তি, সামর্থ্য, অপূর্ব নৈপুণ্য, সাবলীলতা, সজীবতা, মেধা প্রভৃতি লাভ করে। আর এসবই জীবনকে করে তুলতে পারে সুন্দর। তাই প্রতিটি মানুষেরই অধ্যবসায়ী হওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয়। কারণ সে পথেই আসে উন্নতি, জীবন হয় কাক্সিক্ষত মাত্রায় সুন্দর। আর এ পথেই জীবন হবে সুন্দর, মহৎ হবে কর্ম, স্মরণীয় হবে পদচিহ্ন, সুমহান হবে মনুষ্যত্ব আর অপূর্ব হবে চরিত্র।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.