স্বাধীনতা দিবস রচনা

স্বাধীনতা দিবস রচনা
অথবা,বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ
অথবা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

ভূমিকা : পৃথিবীর প্রতিটি স্বাধীন জাতির অভ্যুদয়ের বা স্বাধীনতা অর্জনের একটি ইতিহাস আছে। স্বাধীনতা এমনি এমনি অর্জন করা যায় না। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি স্বাধীন জাতি তাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছে রক্তের বিনিময়ে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ আজ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ তারিখে পালিত হয়। তবে এ স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে রয়েছে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের গৌরবােজ্জ্বল ইতিহাস। দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী রক্ত ক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। এবং এই দিনটিকে আমরা স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করি। এবং এই স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ মুক্ত হয় বিদেশি শাসন-শােষণ, নির্যাতন-নিপীড়নের হাত থেকে। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাঙালি জাতির প্রেরণা হয়ে থাকবে চিরদিন। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, বাঙালি জাতি থাকবে, ততদিন এ চেতনাই হবে বাঙালি জাতির সার্বিক উন্নতির মূলমন্ত্র। এবং যুগের পর যুগ পালিত হবে স্বাধীনতা দিবস!

স্বাধীনতা সংগ্রাম বা মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি : বাংলাদেশের ইতিহাস-বিদেশিদের শাসন, শােষণের ইতিহাস। বলা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই এদেশ শাসন করে আসছে বিদেশিরা। সেই শশাঙ্ক থেকে পাল-সেনদের কথা বাদ দিয়ে মুঘল, ইংরেজ বা পাকিস্তানি যাদের কথাই বলি না কেন, তারা কেউ এদেশের সন্তান ছিল না। তারা সবাই ছির বিদেশি-বিভাষী। তারা এদেশে এসেছে নানা কারণে। কিন্তু এসে ছলে-বলে-কলে কৌশলে দখল করে নিয়েছে এদেশের শাসন ক্ষমতা। ইংরেজরা এদেশে আসে বাণিজ্য করতে। কিন্তু ধূর্ত ইংরেজরা অচিরেই প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন পলাশীর আম্রকাননে মীরজাফরের সহায়তায় নবাব সিরাজ-উদদৌলাকে পরাজিত করে ক্ষমতা দখল করে নেয়। আর সেদিনই অস্তমিত হয় বাংলাদেশের শেষ স্বাধীনতার সূর্য। তারপর প্রায় দু’শ’ বছর ইংরেজরা এদেশের মানুষের ওপর চালায় শাসন-শােষণ, নির্যাতনের স্টিম রােলার। তাঁদের সময় থেকেই অনেক বাঙালি বীর সন্তান বিভিন্ন সময়ে মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছে।

যেমন: ফকির বিদ্রোহের নেতা মজনু শাহ, বারাসাত বিদ্রোহের নেতা তিতুমীর, ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা হাজী শরীয়তুল্লাহ এবং সর্বশেষ ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহকারী সৈনিকগণ। তাঁদের চেতনা ধারণ করেই উনবিংশ শতাব্দীতে ভারতীয় বাঙালিরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে নানা আন্দোলন ও সংগ্রাম করে ১৯৪৭ সালে অর্জন করে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র পাকিস্তান। কিন্তু ইংরেজরা বাঙালিদের যেভাবে শাসন শােষণ করত, পশ্চিম পাকিস্তানিরাও বাঙালিদের ওপর ঠিক সেভাবেই শাসন-শােষণ চালাতে লাগল । পূর্ব-বাংলার মানুষ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের খেয়াল খুশির পুতুল, আর শােষণ-বঞ্চনার পাত্র হয়ে গেল। এমনকি ভাষা আন্দোলনের চেতনা ধরেই ‘৫৪-তে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে জয়, ৬৯- এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এককভাবে বিজয় অর্জিত হয়। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক চক্র ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে নানান টালবাহানা শুরু করে। সময় ক্ষেপণ করে ২৫শে মার্চ রাতের আধারে এদেশের ঘুমন্ত মানুষের ওপর বর্বর হামলা চালায় তারা; উদ্দেশ্য এদেশের অধিকার সচেতন মানুষকে চিরতরে নিস্তব্ধ করে দেওয়া। কিন্তু বাঙালি তাে হার মানা জাতি নয় । কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায়,

“সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী
অবাক তাকিয়ে রয়;
জ্বলে-পুড়ে-মরে ছারখার
তবু মাথা নােয়াবার নয়।”

বাঙালিরা জেগে ওঠে দুর্বার সংগ্রামে। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতা যুদ্ধ। তারা বাঙালির প্রাণ মুখের ভাষা ও কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করল। আর তখনই বীরের জাতি বাঙালি গা-ঝাড়া দিয়ে জেগে উঠল, সংঘটিত হলাে ভাষা আন্দোলন। আর তারপর থেকেই জাগ্রত হলাে তাদের মুক্তির চেতনা।

ভাষা আন্দোলন ও অন্যান্য আন্দোলনে মুক্তিযুদ্ধের বা স্বাধীনতা অর্জনের চেতনা : ভাষা আন্দোলন এদেশের মুক্তিসংগ্রামের মা। এ আন্দোলনই জাতিকে সর্ব প্রথম ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ও অধিকার আদায়ের মূলমন্ত্র দীক্ষা দেয়। ১৯৪৮ সালে ভাষা কেন্দ্রিক এ আন্দোলনের সূত্রপাত এবং ১৯৫২ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারিতে সালাম, বরকত, জব্বার, রফিক, শফিউরসহ আরাে অনেকের রক্তের বিনিময়ে, প্রাণের বিনিময়ে ফলপ্রসূ হয় ভাষা আন্দোলন। তারপর একের পর এক আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশ এগিয়ে যায় স্বাধীনতার পথে।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু ও স্বাধীনতা ঘােষণা : বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন চিরতরে মুছে দেওয়ার জন্য ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালাে রাতে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ শুরু করে পশ্চিম পাকিস্তানের ইয়াহিয়া, টিক্কা খান। রাতের অন্ধকারে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত বাহিনীকে তারা লেলিয়ে দেয় ঘুমন্ত নিরীহ বাঙালিদের নিধন করতে। হিংস্র পাক-সেনাবাহিনী ঢাকার পিল খানা, ইপিআর হেডকোয়ার্টার, রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রনায়ক শেখ মুজিবকে বন্দি করে নিয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে। কিন্তু যাওয়ার আগে তিনি স্বাধীনতার ঘােষণা দিয়ে যান। তাছাড়া ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় তিনি জোরালাে ভাবে ঘােষণা করেন- “এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এরপর এ ঘােষণার সাথে সাথে সারা দেশে শুরু হয় মুক্তির সংগ্রাম।

মুক্তিবাহিনী ও মুজিবনগর সরকার গঠন : স্বাধীনতা সংগ্রামের কাক্ষিত বিজয় অর্জনের লক্ষ্যে জেনারেল এম এ জি ওসমানীর নেতৃত্বে সাবেক ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, ছাত্র-যুবক, কৃষক-মজুর, ব্যবসায়ী শ্রমিকসহ সব শ্রেণির সব সম্প্রদায়ের মানুষ। নিয়ে গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। তারা দেশের অভ্যন্তরে ও দেশের বাইরে ভারতের সীমান্বর্তী অঞ্চলগুলােতে অবস্থান ও নামমাত্র ট্রেনিং নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রুসৈন্যের ওপর। অন্যদিকে ১০ই এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় এবং ১৭ই এপ্রিল আনুষ্ঠানিক ভাবে সরকার শপথ গ্রহণ করে। সরকারের দপ্তরের কাঠামাে ছিল নিম্নরূপ :

★রাষ্ট্রপতি- শেখ মুজিবুর রহমান
★উপরাষ্ট্রপতি- সৈয়দ নজরুল ইসলাম (অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি)
★প্রধানমন্ত্রী- তাজউদ্দিন আহমদ
★পররাষ্ট্র মন্ত্রী- খন্দকার মােশতাক আহমদ
★অর্থমন্ত্রী- ক্যাপ্টেন মনসুর আলী
★স্বরাষ্ট্র ও পুনর্বাসন- এ এইচ এম কামারুজ্জামান
★মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক- জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী।

১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল কুষ্টিয়ার মেহেরপুর জেলার ভবের পাড়া গ্রামের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে বহু দেশি-বিদেশি সাংবাদিকের সামনে বিপ্লবী সরকার শপথ গ্রহণ করেন। তাছাড়া দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে গঠন করা হয় একটি উপদেষ্টা কমিটি।

এবং এর মাধ্যমেই চুড়ান্ত ভাবে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ব্রতী হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের দেশের সর্বস্তরের জনগণ। কৃষক- শ্রমিক ধনী- গরীব সর্ব স্তরের মানুষ ঝাপিয়ে পড়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে। যার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। এবং এই সংগ্রামে শহীদ হওয়ার মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ভালাবাসা এবং স্বাধীনতা অর্জনের আনন্দ উৎসব পালন করার জন্য ২৬ মার্চ তারিখকে বেছে নেওয়া হয়। কারন এই দিনটিতেই বাঙ্গালী জাতি স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য একটি ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

মুক্তিযুদ্ধ ভারতের সহযােগিতা ও চূড়ান্ত বিজয় : ২৬ মার্চ স্বাধীনতা সংগ্রামের পর দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী বাংলাদেশের জেগে ওঠা মানুষ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে হায়েনা পশ্চিম পাকিস্তানি দের সাথে। তারা সামান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গেরিলা আক্রমণ চালিয়ে কাবু করে পাক সেনাদের। তাদের নানা ভাবে সাহায্য- সহযােগিতা করে ভারত। শেষে প্রত্যক্ষ ভাবেই তারা মুক্তি বাহিনীর সাথে যুদ্ধে যােগ দেয়। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে গড়ে তােলা হয় যৌথ বাহিনী। এ যৌথ বাহিনীর আক্রমণে পর্যদস্ত হয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার সৈন্যসহ পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল নিয়াজি মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। অবসান হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের। বাংলার আকাশে আবার উদিত হয় লাল-টকটকে রক্তিম স্বাধীনতার সূর্য। বাঙালিরা পায় তাদের স্বাধীন দেশ, স্বাধীন ভাষা, স্বাধীন লাল-সবুজের পতাকা এবং চির কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং স্বাধীনতা দিবস : মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এদেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষের মনের অত্যন্ত গভীরে প্রােথিত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সদ্যগঠিত সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম এক বেতার ভাষণে বলেছিলেন, “আমরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি সেসব শহীদের কথা, সেসব অসীম সাহসী বীর যােদ্ধার কথা, যাঁরা তাঁদের আত্ম বলিদানের জন্য অমর হয়েছেন, তারাই আমাদের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন চিরকাল।”

এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনেে জন্য এবং আমরা তাদের আত্মবলিদানের কথা যেন ভূলে না যাই এ কারনেই মূলত স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি অম্ল মধুর দিন। কারন একদিকে যেমন লাখো মানুষের স্বজন হারানোর বেদনা ঠিক তেমন স্বাধীনতার মধুর স্বাদ গ্রহন। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালিত হয়ে থাকে। পতাকা উত্তোলন, প্যারেড, বিভিন্ন দেশাত্মবোধক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হয় দিনটি। এটি আমাদের একটি জাতীয় দিবস। এবং সরকারি ছুটির দিন।

উপসংহার : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িয়ে আছে এদেশের ছাত্র-যুবক, কৃষক-শ্রমিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সৈনিক, নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ, হিন্দু-মুসলিম, খ্রিষ্টান-বৌদ্ধসহ সব শ্রেণির মানুষের রক্তদানের স্মৃতি। রাজাকারদের বিভীষিকাময় হত্যাযজ্ঞ ও নির্মমতার কথাও স্পষ্ট করে লেখা আছে ইতিহাসে। ৩০ লাখ শহিদের প্রাণ আর দুই লাখ মা-বােনের নির্যাতনের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস কোনােক্রমেই ভুলে গেলে চলবে না বরং তা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশগঠনে ব্রতী হতে হবে প্রতিটি মানুষকে। দেশের সব শ্রেণির মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারলে তবেই আসবে স্বাধীনতা অর্জনের প্রকৃত সার্থকতা; সার্থক হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এবং এই স্বাধীনতা দিবসের মাধ্যমেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌছে দিতে হবে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস। এবং একটি সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র গঠনে সবাইকে একজোট হতে হবে। তবেই সার্থক হবে শহীদের ত্যাগ।

বাংলার ইতিহাসে কাল বিভাজন

বাংলার ইতিহাস পুনর্গঠন বা আলােচনা প্রসঙ্গে সময় এবং সময়ের বিভাজনটিকে বিবেচনায় আনতে হয়। কাল বিভাজনের ইউরােপীয় স্টাইল বর্তমান বাংলার ইতিহাসের ক্ষেত্রেও প্রয়ােগ করা হয়। বাংলায় প্রথম মানুষের বসতি স্থাপন এবং তারপর বিশাল পথ পরিক্রমার মাধ্যমে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিবর্তিত অবস্থাকে তিনটি কালে ভাগ করা যায়। যথা :

১. প্রাগৈতিহাসিক কাল
২. ঐতিহাসিক কাল ও
৩. আধুনিক কাল।

প্রাগৈতিহাসিক কাল (Prehistorical period):

প্রাগৈতিহাসিক কালকে পুরােপলীয় ও নবােপলীয় এ দুভাগে ভাগ করা যায় । পৃথিবীতে মানুষের বসবাসের ইতিহাস ২৫ লক্ষ বছর পুরােনাে।” সর্বপ্রথম কোন সময় বাংলার মানুষের বসতি আরম্ভ হয় তা জানার কোন উপায় নেই। তবে বাংলার আদিম মানব সভ্যতার বিবর্তন হয়েছিল। এখানে প্রত্ন ও নব্য প্রস্তর এবং তাম্রযুগের অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া গেছে। পুরােপলীয় যুগে মানুষের ব্যবহৃত আয়ুধ (Cleavers) হাত কুঠার (Handaxes), মাংস কাটরা (Choppers) যন্ত্র পাওয়া গেছে। মেদিনীপুর জেলার অরগণ্ডা, সিলদা, অষ্টজুরি, শহর ভগবন্ধু জাগর গ্রাম, কুকরাদুলি, গিড়ানা ও চিলকীগড়; বাকুরা জেলার কাল্লা ওলান বাজার, মনােহর, বন অসরিয়া, শহর জোড়া, কাকড়াদারা, বাউরিডাঙ্গা, শশুনিয়া ও শিলাবদী নদীর প্রশাখা জয় গন্ডা নদীর অববাহিকা; বর্ধমান জেলার গােপালপুর, সাত আনিয়া, বিলগ, সাগরডাঙ্গা আরও খুরপীর জঙ্গল ও কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ে পুরােপলীয় যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০ অব্দে। খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০ হাজার অব্দ থেকে তাম্রযুগ পর্যন্ত খ্রিস্টপূর্ব ২,০০০ হাজার অব্দ পর্যন্ত।

নবপলীয় যুগে বাংলার পশুপালন এবং পরে কৃষি ও বয়ন এর উদ্ভব হয়। নব্য প্রস্তরযুগ পর্যন্ত মানুষ আয়ুধ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি প্রস্তর দ্বারা নির্মাণ করতাে। পরে। তামার ব্যবহার শুরু হয়। এ যুগে বাংলার তাম্রযুগীয় সভ্যতা শুরু হয়। এ পর্যায়ে বাংলার নগরায়ণ শুরু হয়। বাংলায় এ রূপ নগর সভ্যতার নিদর্শন হচ্ছে পাণ্ডুরাজার ঢিবি এবং ওয়ারী বটেশ্বর। পাণ্ডুরাজার ঢিবি বর্ধমান জেলার আউস গ্রাম থানায় অবস্থিত। ১৯৬২-১৯৬৫ সালে খনন করে অজয়, কুন্নর ও কোপাই নদীর উপত্যকায়। নবপলীয় সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গেছে। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ হাজার বছর পূর্ব থেকেই এখানে মানুষ নবপলীয় সংস্কৃতির অধিকারী হয়। এ সভ্যতার লােকেরা সুপরিকল্পিত নগর ও রাস্তাঘাট তৈরি করতাে। তারা গৃহ ও দুর্গ এ উভয়ই নির্মাণ করতাে। তামার যন্ত্রপাতি আসবাবপত্র প্রভৃতির নিদর্শন থেকে তাদের উন্নত জীবনযাত্রার পরিচয় মিলে। কৃষি ও বাণিজ্য তাদের অর্থনীতির প্রধান বৃত্তি ছিল। বিদেশের সাথে তারা ব্যবসায় বাণিজ্য করতাে। এ সভ্যতার লােকেরা ধান ও অন্যান্য শস্যের উৎপাদন করতাে এবং পশুপালন ও কুম্ভকারের কাজ জানতাে। পূর্ব-পশ্চিম দিকে শয়ন করে তারা মৃতব্যক্তিকে সমাধিস্থ করতাে। এ অঞ্চলে মাতৃকা দেবীর পূজা প্রচলিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের দিকে আর্যরা সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস করে ভারতে প্রবেশ করে। আর্যরা ভারতে লাের প্রচলন করে। এ সময় বাংলায় অস্ট্রিক জাতি বসবাস করতাে। বৈদিক যুগের শেষ ভাগে বাংলায় আর্য প্রভাব বৃদ্ধি পায়। গ্রিক বিবরণ থেকে জানা যায় যে, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ অব্দে বাংলায় গঙ্গারিডই জাতি বাস করতাে। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের পর বাংলার মৌর্য শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পরবর্তী বাংলার ইতিহাস অন্ধকারাচ্ছন্ন । যদিও বাংলায় কুষাণ ও শুP আমলের মুদ্রা পাওয়া গেছে তবে ধারাবাহিক ইতিহাস রচনার তথ্যসংগ্রহ বেশ কঠিন। তবে আমলের দালিপি ও সাহিত্যিক উপাদান প্রাপ্ত হওয়াতে এ সময়ের ইতিহাস আমাদের কাছে স্পষ্ট। এ দিক থেকে বিবেচনা করলে গুপ্ত শাসনকে নবপলীয় যুগের শেষ পর্যায় এবং ঐতিহাসিক কালের সূচনা পর্ব ধরা যেতে পারে ।

বাংলার ইতিহাস ঐতিহাসিক যুগ বা প্রাচীন কাল:
(Ancient Period of the History of Bengal)

বাংলায় গুপ্ত শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযােগ্য পরিবর্তন আসে। বাংলা গুপ্ত শাসনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এখানে ধ্রুপদী সংস্কৃত সাহিত্য, শাসন, নাগরিক জীবনবােধ এবং সুগঠিত শাসন পদ্ধতি গড়ে উঠে। গুপ্ত শাসন উদার হওয়ায় বৌদ্ধ সংস্কৃতিও বিকশিত পর্যায় ছিল। ব্যবসা বাণিজ্যের বিকাশ হওয়ায় জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। গুপ্ত শাসনের বিলুপ্তির পরবর্তী পর্যায় রাজা শশাঙ্ক বাংলার গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সম্ভবত এ পর্যায়ে বাংলার জনপদগুলাে তাদের সত্তা হারিয়ে গৌড়ে রাজ্য বিলীন হয়। এরপর বঙ্গ জনপদে বাকি জনপদগুলাে বিলীন হয়। এ সময় বাংলার বৌদ্ধ ও জৈন এ দুটি সংস্কৃতির ধারা প্রবাহমান ছিল। পাল আমলে বৌদ্ধরা শক্তি অর্জন করে। পালদের সাথে হিন্দু সংস্কৃতির সংঘাত জোরালাে হয়। এ পর্যায়ে বাংলার সামন্ত সমাজ ও রাষ্ট্রের অবক্ষয় দেখা দেয়। এ পর্যায়ে বাণিজ্য পুঁজিতে উদীয়মান মুসলিম রাজশক্তি তুর্কিদের নেতৃত্বে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলার হিন্দু সংস্কৃতির উপর আঘাত হানে। বৌদ্ধরা আগত মুসলিম শক্তিকে অভ্যর্থনা জানায়। বাংলায় ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের সাথে সাথে প্রাচীন যুগের অবসান ঘটে। ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে তুর্কিরা পূর্ব রােমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনােপল দখলের সাথে সাথে যেমন মধ্যযুগের অবসান ঘটে ঠিক তেমনি ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি সেনাপতি বখতিয়ার খলজি বাংলার অস্থায়ী রাজধানী লক্ষ্মণাবতী দখলের সাথে সাথে বাংলার ইতিহাসের প্রাচীন যুগের অবসান ঘটে।

কাল বিভাজনের প্রয়ােজনীয়তা (Importance of Periodisation):

কাল নদীর প্রবাহ ধারার ন্যায় অবিভাজ্য ও অখণ্ডিত। কিন্তু ইতিহাসে ঘটনা। প্রবাহের ধারায় পৌরাপর্বের অর্থাৎ ঘটনার পূর্বা ও পর বুঝার জন্য কালকে বিভাজন করা হয়। কাল বিভাজন বা পর্ব বিভাগের একটি ব্যবহারিক যুক্তিও আছে। যে ইতিহাসের কালসীমা খুব সংক্ষিপ্ত দু’চার দশ বছর মাত্র সে ক্ষেত্রে পূর্ব বিভাগের (কাল বিভাজনের) ব্যাপারটা সাধারণ জটিল কিছু নয়। কিন্তু কালসীমা যে ক্ষেত্রে দীর্ঘব্যাপ্ত কালকে হাতের মধ্যে ধরে সেই কালের বিচিত্র ও অগণিত তথ্য ও ঘটনাবলির বর্ণনা, বিশ্লেষণ ও বিচার, যুক্তি শৃঙ্খলা সেগুলাে সাজানাের মধ্যেই ঐতিহাসিকদের দক্ষতা এবং ইতিহাসের মূল্য নির্ভর করে। এ পর্ব বিভাগের সাহায্যেই ইতিহাস পুনর্গঠন যুক্তিযুক্ত হয়।

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে প্রোটো-ঐতিহাসিক যুগ

ঐতিহাসিক যুগের ঠিক পূর্ববর্তী যুগকে আদি ঐতিহাসিক বা প্রােটো (Proto) ঐতিহাসিক যুগ বলা হয়। সাধারণত বৈদিক যুগকে প্রােটো ঐতিহাসিক যুগ বলা হয়। এ যুগের বেদ, উপনিষদ প্রভৃতি শাস্ত্র প্রচারিত হয়। এ যুগে লিপি আবিষ্কার হলেও তা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল না। বেদ, উপনিষদ প্রভৃতি শাস্ত্র শ্রুতি আকারে রক্ষিত হতাে। ঐতিহাসিক বাসাম এর মতে, “বেদ, ব্রাহ্মণ ও উপনিষদের যুগ ভারত ইতিহাসের গৈতিহাসিক এবং ঐতিহাসিক যুগের মধ্যবর্তী যুগ।”

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে মধ্যযুগ
Middle Age of the South Asian History

দক্ষিণ য়ার ইতিহাসে ঐতিহাসিক যুগের শেষ পর্যায় বলা যায় সিন্ধুসভ্যতার পতন কাল পর্যন্ত সময়কে। এরপর ঋকবৈদিক সময় থেকে প্রাচীন যুগ শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় হিন্দু সভ্যতার শেষ পরিণতির সময় কাল ধরা যেতে পারে ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে তরাইনের ২য় যুদ্ধের সময় কালকে । ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতে কুতুব উদ্দীন আইবেক স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ভারতে মুসলিম রাজত্বের যুগ শুরু হয়। ১২০৬ থেকে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সুলতানি আমল এবং পরবর্তী মুঘল শাসনামলকে মধ্যযুগের অন্তর্ভুক্ত করা যায় । তবে মধ্যযুগের শেষ পর্যায় কোন সময়কে ধরা হবে তা নিয়ে মতপার্থক্য আছে। অনেকের মতে ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সময় কাল থেকে মধ্যযুগের শেষ হয়। আবার অনেকের মতে, ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর হতে ভারতে ব্রিটিশ পুঁজি ও রাজনৈতিক শক্তি প্রভাব বিস্তার করে এবং ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে মধ্যযুগের শেষ অধ্যায় বলা যেতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে আধুনিক যুগ
Modern Period of the South Asian History

১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ইউরােপের ইতিহাসে আধুনিক যুগের সূচনা হলেও দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে ইউরােপের কাল বিভাজনের রীতি বা তার বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কাল বিভাজন এবং উল্লিখিত সময় কালকে আধুনিক ইতিহাসের প্রারম্ভিক কাল হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়। ধর্মীয় শিষ্ট্যের ভিত্তিতে অর্থাৎ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধের সময় কালকে অথবা ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে কুতুবুদ্দীন আইবেক কর্তৃক ভারতে স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠার সময় কালকে মধ্যযুগের |

প্রারম্ভিক কাল ধরলে, ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদদৌলার পরাজয় কিংবা ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিপাহি বিদ্রোহে ইংরেজদের ফলতাকে মধ্যযুগের শেষ। পরাজয় ধরলে এবং ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতে ইংল্যান্ডের সরাসরি শাসনকালকে আধুনিক যুগের সূচনা কাল বিবেচনা করা যায়। তবে ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের নবাব সিরাজউদদৌলার পরাজয়কে আধুনিক ভাবধারায় শাসন পদ্ধতি, ইউরােপীয় শিক্ষা বিশেষ করে উপযােগবাদী জীবনধারা ভারতে বিকাশ লাভ করার পথ উন্মুক্ত হয় । পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজের পতনের ফলে ভারতে ইংরেজদের রাজনৈতিক আদিপত্যের সূচনা হয়। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভ, ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রবর্তনের ফলে জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করে পুঁজিবাদী অর্থনীতির পটভূমি তৈরি করা হয়। এরপর ভারতে ইংরেজিকে অফিসিয়াল ভাষা এবং শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা ভারতের সমাজ কাঠামােতে যুগান্তকারী পরিবর্তন সূচনা হয়। ইংরেজি শিক্ষা ও পাশ্চাত্য ভাবধারা প্রচারের ফলে হিন্দুধর্মের কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসে আঘাত হানে। ইয়ং বেঙ্গল গােষ্ঠী হিন্দুধর্মের কূপমন্ডুকতা ও পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তােলে । এর ফলে রামমােহন হিন্দুধর্মের সংস্কার আন্দোলন শুরু করে এবং ব্রাহ্ম ধর্মপ্রচার করে হিন্দুধর্মের এক ঈশ্বরবাদের প্রচার করেন। এরপর মহীষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্র সেন, আনন্দ মােহন বসু প্রমুখ আরাে অনেকে হিন্দুধর্মের সংস্কার করেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হিন্দু ধর্মে নারীর অধিকার, শিশুকন্যা বিবাহ নিষেধ এবং নারী শিক্ষার উন্নতির চেষ্টা করেন। এর ফলে হিন্দুসমাজে ধর্ম ও জীবনবােধের যুগান্তকারী সূচনা হয়। হিন্দুসমাজে আধুনিকতার উন্মেষ ঘটে। এ দিক থেকে বিবেচনা করলে অষ্টাদশ শতাব্দীর দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসকে আধুনিক যুগের প্রারম্ভিক কাল। বলা যেতে পারে এবং ১৭৫৭, ১৭৬৫ কিংবা ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতে ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তনের সময় কালকে আধুনিক যুগের সূচনা কাল বলা যেতে পারে।”

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে কাল বিভাজন

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে প্রাগৈতিহাসিক যুগ (Prehistory Age In the History of South Asia) : প্রাচীন পাথরের হাতিয়ারের ভিত্তিতে মানুষের সংস্কৃতিকে বুঝার জন্য গ্রিকগণ এ নামটি (Palaeolithic) ব্যবহার করেছেন। তবে পণ্ডিতগণ প্রাগৈতিহাসিক মানুষের ব্যবহৃত পাথরের যন্ত্রপাতি এবং নব্য প্রস্তরযুগের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির আলােকে প্রাচীন দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ইতিহাস পুনর্গঠন করেছেন। পণ্ডিতগণ মনে করেন যে, পাঁচ লক্ষ বছর আগে দক্ষিণ এশিয়ার মাটিতে মানুষ বসবাস করতাে। অনেক পণ্ডিতের ধারণা এই যে, দ্বিতীয় বরক যুগ হতে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ বসতি আরম্ভ করে। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রমাণাদি বিবেচনা করে প্রত্নতাত্ত্বিকরা সিদ্ধান্তে পৌছেন যে, চার থেকে দুই লক্ষ বছর আগে এশিয়ায় জনবসতি ছিল। মানুষের বসবাস এবং তাদের ব্যবহৃত হাতিয়ার এবং জীবনযাত্রাকে ভিত্তি করে প্রাগৈতিহাসিক কাল চারটি অংশে ভাগ করা হয়েছে ।

যথা :
১. প্রাচীন প্রস্তরযুগ;
২. মধ্য প্রস্তরযুগ;
৩. নব্য প্রস্তরযুগ ও
৪. ধাতুর যুগ।

১. প্রাচীন প্রস্তরযুগ (Palaeolithic age) : প্রাগৈতিহাসিক কালে মানুষের ব্যবহৃত সবরকম হাতিয়ার ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র ছিল অমসৃণ পাথরের তৈরি। এ প্রাচীন প্রস্তরযুগের সঠিক কাল বিষয়ে সর্বজনস্বীকৃত মত তৈরি হয় নি। অধিকাংশ পণ্ডিত মনে করেন যে, খ্রিস্টপূর্ব ৪,০০,০০০ লক্ষ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২,০০,০০০ অব্দের মধ্যবর্তী সময় কালকে প্রাচীন প্রস্তরযুগের সময় কাল নির্ধারণ করেছেন। এ যুগের মানুষের ব্যবহার করা দ্রব্যের নিদর্শনাদি পাকিস্তানের অন্তর্গত পাঞ্জাবের সােয়াননদীর অববাহিকায়, মাদ্রাজের নীলগিরি অঞ্চলে পাওয়া গেছে। এ হাতিয়ারগুলো কোয়ার্টজ পাথর দ্বারা তৈরি হতাে বলে এ সংস্কৃতিকে কোয়ার্টজ সংস্কৃতি এবং এ হাতিয়ার ব্যবহারকারী মানুষকে কোয়ার্টজন মানব (Quartzan man) বলা হতাে।

প্রাচীন পাথর যুগের মানুষ জীবনধারণের জন্য প্রয়ােজনে শিকার ও গাছের পযােণী লতাগুলু সংগ্রহ করতো। অর্থাথ এ যুগ ছিল খাদ্য সহকারীদের যুগ । বন্য পশু শিকার এ যুগের প্রধান অর্থনীতি ছিল । মানুষ বেঁচে থাকার প্রয়ােজনে সংঘবদ্ধ হয়ে বাস করতো। ফলে এ সময়ে গােষ্ঠীবদ্ধ জীবনযাপনের উদ্ভব হয়। অনেক পণ্ডিত মনে কবেন যে, প্রাচীন প্রস্তরযুগে মানুষ জঙ্গলে, নদী ও হ্রদের তীরে বাস করতো। প্রাচীন পাগবেনা যুগে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ আগুনের ব্যবহার জানতাে। পাথরের যুগে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ আগুনের ব্যবহার জানতাে। তারা শিকারকে আকৃষ্ট করার জন্য গুহাতে প্রাণীর চিত্র একে জাদু অনুষ্ঠান করতাে। এ সময়ে কোন কবর পাওয়া যায় নি।সম্ভবত মৃত দেহকে হাঁটু ঘুরে বসিয়ে কবর দিতাে। প্রাচীন প্রস্তরযুগের লােকেরা ছিল নিগ্রোটো জনগােষ্ঠীর পূর্বপুরুষ। ভারতের আন্দামানে তাদের বংশধরেরা এখনাে বসবাস করে বলে মনে করা হয়। এরা ছিল খর্বাকৃতির কৃষ্ণকায় চেপ্টা নাক বিশিষ্ট এবং এদের মাথার চুল ছিল কোকড়ানাে।

২, মধ্য প্রস্তরযুগ (Mesolithic age) : প্রাচীন ও নব্য প্রস্তরযুগের অন্তর্বর্তীকালীন যুগকে মধ্য প্রস্তরযুগ বলা হয়। তবে এ দুই যুগের মধ্যে কোন সীমাৱেখা দেখানাে অনেকটা কঠিন। অধিকাংশ পণ্ডিত মনে করেন যে, খ্রিস্টপূর্ব ২,০০,০০০ অব্দ ও খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০ অব্দের মাঝামাঝি সময় সম্ভবত মধ্য প্রস্তরযুগ চলছিল। এ সময় মানুষ তার পারিপার্শ্বিক বাধাবিপত্তি দূর করার দিকে মন দেয়। এ যুগে পাথরের তৈরি হাতিয়ার ও অন্যান্য সাহায্যের নিদর্শন দক্ষিণে তিনেডাল, গুজরাট, সবরমতি,  েম্বাইয়ের উপকূল অঞ্চলে, গােদাবরি ও নর্মদা উপত্যকায় এবং মহিশুরের নীলগিরি অঞ্চলে পাওয়া গেছে। এ যুগের মানুষের প্রধান হাতিয়ার ছিল পাথরের ফলা ও ছোট ছােট পাথরের নুড়ি যা তীরের অগ্রভাগে ব্যবহার করা হতো। এ যুগে মাটির তৈরি পাত্রের ব্যবহার শুরু হয়। তবে কুকারের চাকা তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নি। অনেক পণ্ডিত মনে করেন যে, কুকারের চাকার আবির্ভাব ঘটে নব্য প্রস্তরযুগের শেষের দিকে কিংবা নব্য প্রস্তর সূচনায়। এ যুগেই জীবজন্তুকে পােষ মানানাের চেষ্টা শুরু হয়। পশু শিকার, মৃৎশিল্পের অগ্রগতি, চাষাবাদের প্রাথমিক চেষ্টা ইত্যাদি এ যুগের বৈশিষ্ট্য ছিল। মধ্য প্রস্তরযুগের মানুষ সিলেকেট ও সিলসিংগেনি পাথর দিয়ে হাতিয়ার তৈরি করতাে। এ যুগের মানুষ পশু শিকার, মৎস্য শিকাৱ এবং ফলমূল আহার করে জীবনধারণ করতাে। পশুর হাড় এবং পাথর দিয়ে বড়শি তৈরি করে মাছ ধরতাে। এ যুগের পাথরের অস্ত্র ও হাতিয়ার ছিল অতি ক্ষুদ্র এজন্য এগুলােকে ক্ষুদ্র পাথর বা (Microliths) বলা হয় ।

৩. নব প্রস্তরযুগ (Neolethic age) : মানুষের অগ্রগতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ যুগের নাম ছিল নবপলীয় বা নব্য প্রস্তরযুগ। মধ্য প্রস্তরযুগের পরবর্তী উন্নত সভ্যতা। হলাে নব্য প্রস্তরযুগের সভ্যতা। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-৫০০০ অব্দে নব্যপ্রস্তর যুগ। এ যুগ। নব্য প্রস্তরযুগ বলা হয় এ কারণে যে, এ যুগেও মানুষকে একান্তভাবে পাথরের সরঞ্জাম। ও উপকরণের উপর নির্ভর করতে হতাে। অনেক পণ্ডিত মনে করেন যে, এ যুগে মনুিষ। স্বর্ণ ও তামার ধাতুর সন্ধান পেয়েছিল। তবুও এ সময় মানুষ ইচ্ছামতাে বিভিন্ন পাথর দিয়ে উন্নতমানের মসৃণ ও সূক্ষ্ম জিনিসপত্র তৈরি করতে পারতাে। নব্য প্রস্তরযুগের সভ্যতা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বত্র কম বেশি পাওয়া গেলেও আর্যাবর্তে এর নিদর্শন সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে সিন্ধু দেশ এবং বেলুচিস্তানে। এছাড়াও পূর্ব ভারতে বিহার, উড়িষ্যা, মালাবার, বেলারী জেলা, গুজরাটের কাথিয়াবাঢ় প্রভৃতি স্থানে নব্য প্রস্তরযুগের সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গেছে। নব্য প্রস্তরযুগে জীবিকা হিসেবে কৃষি ও পশুপালনকে গ্রহণ করেছিল। মানুষ যাযাবর জীবনের সাথে শক্ত পাথর দিয়ে গৃহ তৈরির কৌশল আবিষ্কার করে। বৃষ্টি ও সূর্যের প্রখর তাপের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ঘর তৈরির কৌশল গ্রহণ করেছিল এ যুগে। শস্য উৎপাদন, পশুপালন, ঘরবাড়ি নির্মাণ, আগুনের ব্যবহার, কুম্ভকারের চাকার আবিষ্কার, বস্ত্র বুনন, নৌকা তৈরি প্রভৃতি ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয় । নবপলীয় যুগে মানুষ মৃতদেহকে কবর দেয়া শিখেছিল। নতুন প্রস্তরযুগের কয়েকটি সমাধি পাওয়া গেছে। এ থেকে জানা যায় যে, সে সময় মৃতদেহ মাটির বৃহদাকার পাত্রে রেখে কবরস্থ করা হতাে। কোন কোন সমাধির উপর পাথরের আচ্ছাদন দেয়া হতাে। পাথরের খুঁটির উপর এ আচ্ছাদন থাকতাে।

নবপলীয় যুগে কৃষি, পশুপালন, সমাজ সংগঠন প্রভৃতির ক্ষেত্রে উন্নতির ফলে মানুষের জীবনযাত্রার অগ্রগতির ক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয় তা পরবর্তী সময়ে সভ্যতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নবপলীয় যুগে মানুষের এ অগ্রগতিতে নবপলীয় বিপ্লব হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার সিন্ধুসভ্যতা এ নবপলীয় বিপ্লবের নিদর্শন।

৪. ধাতুর যুগ (Age of metals) : নবােপলীয় যুগের পরে মানুষের অগ্রগতির যুগকে ধাতুর যুগ বলা হয়। এ যুগে তামা, ব্রোঞ্জ এবং পরে লােহার যন্ত্রপাতি ব্যবহার শুরু হয়েছিল। তবে এ যুগেও পাথরের কিছু কিছু হাতিয়ার ও সরঞ্জামের ব্যবহার ছিল । এজন্য অনেকেই একে তাম্র প্রস্তরযুগ বলে অভিহিত করেন। এ যুগে কৃষি পশুপালন ও মৃৎশিল্পে কুম্ভকারের চাকার ব্যবহার ব্যাপকভাবে শুরু হয়।

এ যুগে তামা ও টিনের মিশ্রণে ব্রোঞ্জের জিনিসপত্র তৈরি হতে থাকে। এজন্য অনেকে এ যুগকে ব্রোঞ্জ যুগ বলে অভিহিত করেছেন। ব্রোঞ্জের পরে লােহার আবিষ্কার হয়। লােহার ব্যাপক ব্যবহার অর্থনীতি ও রাজনীতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়।

এজন্য লােহার আবিষ্কার ও তৎপরবর্তী যুগকে লৌহ যুগ বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। দক্ষিণ এশিয়ার আর্যদের আগমনের শুরু থেকেই লৌহ যুগ শুরু হয়। আর্যরা ভারতে লােহার প্রচলন করেছিল ।

রােমান সাম্রাজ্যের পতন ও মধ্যযুগ

প্রাচীন যুগে রােমান সাম্রাজ্যের পতন বিশ্ব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রাকৃতিক নিয়মেই প্রতিষ্ঠা, প্রসার, অবক্ষয় ও পতন হয়। ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন এর মতে, সম্রাজ্য মানুষের মতাে জন্ম ও মৃত্যুর অধীন। রােমান সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় নি । রােমান সাম্রাজ্যের পতনের বহুবিদ কারণ ছিল, যেমন- সম্রাটদের অযােগ্যতা, সেনাবাহিনীর দুর্বলতা, জার্মান আক্রমণ, অর্থনৈতিক সংকট, রােমান সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত করেছিল । ঐতিহাসিক গিবন রােমান সাম্রাজ্যের পতনের জন্য খ্রিস্টধর্মের প্রসারকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নিম্নে রােমান সাম্রাজ্যের পতনের কারণসমূহ উল্লেখ করা হলাে :

রাজনৈতিক সংকট : রােমান সাম্রাজ্যের পতনের কারণ ছিল সিংহাসন নিয়ে বিভিন্ন উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বিরােধ । মার্কাস অরেলিয়াসের পুত্র কমােডাস। (Commodus) ১৮০ হতে ১৯২ খিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হন। তারপর অভিজ্ঞ আইনবিদ, সৈনিক ও শাসন কার্যে পটু সেপটেমিয়াস সেভেয়াস রাজত্ব করেন। এরপর রাজত্ব করেন ক্যারাকেলা। এর পর এক অরাজতার সূত্রপাত হয়। সামরিক বাহিনীর প্রতাপ বৃদ্ধি পায়। ২৩৫ খ্রিস্টাব্দ হতে ২৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এদের প্রভাব অক্ষুন্ন থাকে। এদের খেয়াল খুশি মতাে শাসকের পর শাসক আসতে থাকে। এভাবে দুই ডজন লােক ক্ষমতায় আসীন হয় আবার ক্ষমতা হারায়।। ইতােমধ্যে অন্য এক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। জার্মানরা গল, ব্রিটেন, স্পেন ইত্যাদি আক্রমণ করতে থাকে। প্রাচ্যে সাসানীয় বংশের অধীনে পারস্যের উত্থান ঘটে। ২৬০ খ্রিস্টাব্দে পারস্য বাহিনী রােমান সম্রাট ভ্যালেরিয়ান ও তার কিছু সেনাবাহিনীকে বন্দী করে রােমকে অপমানিত করেন।

এর পর দুই জন সৈনিক সম্রাট ডিওক্লেশিয়ান ও কনস্টান্টাইন শাসনদণ্ড পরিচালনা করেন। প্রথম সম্রাট রাজত্ব করেন কুড়ি বা একুশ বছর এবং দ্বিতীয় জন। রাজত্ব করেন ত্রিশ বা একত্রিশ বছর।

ডিওক্রেশিয়ান প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের সামরিক শক্তি হ্রাস করেন। যাতে তারা বিদ্রোহ করার সুযােগ না পায়। দ্বিতীয়ত, প্রদেশের আয়তন তিনি হ্রাস করেন। তৃতীয়ত, তিনি প্রদেশের সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। ফলে প্রদেশের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় একশ। কনস্টান্টাইন ৩০০ খ্রিস্টাব্দে রােমের পূর্বাংশের রাজধানী স্থাপন করেন গ্রিক বাইযানটিয়ামে। যার নামকরণ করা হয় কনস্টান্টিনােপল সম্রাটের নামে। পাশ্চাত্যে রােমের রাজধানী রােম হতে মিলান নগরীতে স্থানান্তরিত হয়। প্রাচ্য ও প্রতীচ্য দুই ভাগে সাম্রাজ্য বিভক্ত হয়ে যায় চিরতরে ৩৯৫ খ্রিস্টাব্দে। ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে রােমের পতন ঘটে। ইতােমধ্যে খ্রিস্টানধর্মের অভ্যুত্থান ঘটে এবং জার্মানদেরও উত্থান হয়।

পতনের পূর্বমুহূর্তে রাজনৈতিক অবস্থাঃ

ডাইক্লেশিয়ান এবং কনস্টান্টাইনের সংস্কার সত্ত্বেও সিংহাসন নিয়ে হত্যা ও ষড়যন্ত্র লেগে থাকে। গৃহ বিবাদের পর কনস্টান্টাইনের পরিবারের প্রায় সকল সদস্যই নিহত হয়েছিল। কেবল মাত্র জুলিয়ান (Julian) রক্ষা পেয়েছিল। জুলিয়ানই ছিলেন কনস্টান্টাইন পরিবারের শেষ ব্যক্তি যিনি সৈনিকগণ কর্তৃক ৩৬০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট বিঘােষিত হয়েছিলেন। অবশ্য এক জুলিয়ান পৌত্তলিকতা আবার পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে ছিলেন। কিন্তু সম্রাট জেভিয়ান (Jovian) আবার খ্রিস্টধর্মকে রাজধর্মে পরিণত করেন। অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার জন্য পরবর্তী সম্রাটগণ সীমান্ত রক্ষা করতে ব্যর্থ হন। রােমের পতনের কারণ নিয়ে আলােচনা করা হলাে :

অর্থনৈতিক কারণ : রােমান সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল দাস নির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার ভাঙন। সাম্রাজ্যের শেষ পর্যায়ে রােমে করদাতা অপেক্ষা। কর আদায়কারীর সংখ্যা ছিল বেশি। এ করের বােঝা বহন করতাে বণিকরা। রােমের কৃষি অর্থনীতি নির্ভর ছিল ভূমিদাসদের শ্রমের উপর নির্ভরশীল। অভিজাতরা ভূমি দাসদের বাধ্যতামূলক শ্রম দানে বাধ্য করতাে। ভূমিদাসদের শ্রম অনুৎপাদনশীল খাতে নিঃশেষ হতাে। দাসদের জীবন অপেক্ষা তাদের শ্রমের মূল্য ছিল বেশি। অতিরিক্ত শ্রমে অনেক ভূমিদাস মৃত্যুবরণ করে। এহেন অবস্থায় সমাজে শ্রম সংকট ও উৎপাদন ব্যাহত হয়। রােমের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে মুদ্রায় অতিরিক্ত খাত মিশানাে হয়। ফলে ব্যবসায়-বাণিজ্য ভেঙে পড়ে। আমদানি নীতির ফলে রােমের সােনা, রুপা বিদেশে চলে যায়। এ অবস্থায় শাসকদের পক্ষে সেনাবাহিনী গঠন ও যুদ্ধ ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন। হয়ে পড়ে।

জাতীয় চেতনার সংকট : রােমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে রােমানদের মধ্যে জাতীয় ঐক্য ও চেতনা শক্তিশালী ছিল কিন্তু কালক্রমে রােমান সাম্রাজ্য এশিয়া, ইউরােপ ও আফ্রিকায় বিস্তার হলে বিভিন্ন জাতি গােষ্ঠী মানুষ রােমান নাগরিকত্ব লাভ করে । রােমানরা ব্যবসায়, কৃষি এবং বাণিজ্যিক কারণে বিদেশে  পনিবেশ গড়ে তােলে। এতে অনেক রােমান বিদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। রােমান সেনাবাহিনীতে বহু। জার্মান জাতির অনুপ্রবেশ ঘটে। ফলে রােমানদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য বিলুপ্ত হয়। বহু জার্মান এবং এশিয়া রােমান সেনাবাহিনী ও প্রশাসনে চাকরি গ্রহণ করে। ফলে রােমান ভাষা। ল্যাটিন এবং রােমান আইন ছাড়া রােমানদের প্রাথমিক বলবীর্যের ঐতিহ্য বিলুপ্ত হয়।

বর্বর আক্রমণ : রােমান সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম কারণ ছিল রােমের বিভিন্ন সীমান্তে বর্বর আক্রমণ। পূর্ব সীমান্তে পারস্য সাম্রাজ্য, শাসনীয় বংশের অধীনে শক্তিশালী হয়ে পশ্চিমে রােম সাম্রাজ্যের অঞ্চল দখল করার জন্য তৎপর হয়। রােমান সম্রাট জুলিয়ানের উত্তরাধিকারী জুবিয়ান পারস্য সম্রাটকে পাঁচটি প্রদেশ ছেড়ে দেন। উত্তর এশিয়ার রামরা শক্তিশালী হয়ে উঠে। পশ্চিম সীমান্তে বিভিন্ন জার্মান জাতিগােষ্ঠী আক্রমণ শুরু করে। জুলিয়াস সিজার জার্মান রাজা এরিওভিসটাসের আক্রমণ প্রতিহত করলেও তখন থেকেই জার্মানরা রােমান সাম্রাজ্য আক্রমণে তৎপর ছিল। পরবর্তীকালে। দুর্বল সম্রাটদের সময় জার্মানরা রােমের সীমান্ত প্রদেশে অনুপ্রবেশ শুরু করে। তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যভাগ ও শেষ ভাগে জার্মান আক্রমণ প্রকট হয়। আলেমানী জাতি (The Alemanni) পশ্চিম সীমান্ত হতে উত্তর ইতালি মিলান আক্রমণ করে। জার্মান জাতির গথ জনগােষ্ঠী দানিউব নদী আক্রমণ করে পূর্ব রােমান সাম্রাজ্য আক্রমণ করে সম্রাট ডেসিয়াসকে হত্যা করে। গথগণ দানিউব নদী অতিক্রম করে রােমান সাম্রাজ্যের সীমান্ত প্রদেশে বসতি স্থাপন করে এ সময় এশিয়ার হুনগণ জার্মানদের আক্রমণ করলে তারা রােমান সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে ঢুকে পরে। ইউরেশিয়ায় বসতি স্থাপনকারী গথগণের উপর যখন হুনরা আক্রমণ কড়ে তখন ওষ্ঠগথ বা পূর্বাঞ্চলীয় গথগণ তাদের নিকট আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু ভিজিগথ বা পশ্চিমাঞ্চলীয় গথগণ রােমানদের আশ্রয় লাভ করে। কিন্তু রােমান কর্মচারীরা তাদের উপর অত্যাচার করলে তারা বিদ্রোহ করে সম্রাট ভেলেনকে হত্যা করে।

রােমান সম্রাট থিউডােসিয়াস (৩৭৯-৩৯৫) দানিউব নদীর দক্ষিণ অঞ্চলে। গথগণকে বসতি স্থাপনের অনুমতি দিয়ে এ অঞ্চলে প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতি আদায় করে। কিন্তু তার মৃত্যুর পর রােমান সাম্রাজ্য তার দুই পুত্রের মধ্যে বিভক্ত হয়। পশ্চিম রােমান সাম্রাজ্য পান হনরিয়াস এবং পূর্ব রােমান সাম্রাজ্য লাভ করেন আর্কাডিয়াস। পূর্ব রােমান সাম্রাজ্য পরবর্তী এক হাজার বছর অটুট ছিল। কিন্তু পশ্চিম রােমান সাম্রাজ্য বিভিন্ন জার্মান সেনাপতি এলারিক, আটিলা, জেজারিক এবং ওডােসার আক্রমণে ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে পতনের সম্মুখীন হয়। হনরিয়াস এর রাজত্বকালে পশ্চিমাঞ্চলীয় গথগণ তাদের নেতা এলারিকের নেতৃত্বে গ্রিসের মধ্য দিয়ে ইতালিতে প্রবেশ করে। হনরিয়াস ভ্যান্ডাল সেনাপতি স্টিলিকো এলারিকের এ আক্রমণ ৪০৪ খ্রিস্টাব্দে প্রতিহত করেন। ৪১০ খ্রিস্টাব্দে এলারিক আল্পস পর্বত অতিক্রম করে রােমের দারপ্রান্তে উপস্থিত হয়ে রােমানদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে। এলারিক সম্রাট হনরিয়াসের নিকট তার সেনাবাহিনীর জন্য ভূখণ্ড দাবি করলে হনরিয়াস তা প্রত্যাখান করে। এলারিক ক্ষুব্ধ হ=ে রােম আক্রমণ করে যাজক ও গির্জার সম্পদ ছাড়া রােমের নাগরিকদের সব কিছু লুণ্ঠ করেন। এলারিকের মৃত্যুর পর জার্মান জাতিসমূহ সাম্রাজ্যের পশ্চিম প্রদেশগুলােতে বসতি স্থাপন করে। ভিজিগথরা আল্পস অতিক্রম করে গল প্রদেশের (ফ্রান্স) দক্ষিC এবং স্পেনে বসতি স্থাপন করে। বর্বর জার্মান জাতির মধ্যে ভ্যান্ডালরা পিরেনীজ পর্ব অতিক্রম করে স্পেনে আক্রমণ চালায়। তখন থেকেই একে আন্দোলেশীয় বা স্টে বলা হতে থাকে। অন্যদিকে ফ্রান্স, ফ্রাংক জাতি গােষ্ঠী এলারিকের রােম আক্রমশে অনেক পূর্ব থেকেই রাইন নদীর পশ্চিমে বসতি স্থাপন করতে থাকে। রােমের পত, পর এরা ফরাসি জাতি হিসেবে পরিচিত হয়। স্টিলিকু পতনে এলারিকের আত্র= প্রতিহত করতে ব্রিটেন থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করলে উত্তর সাগরের তীর থেকে এ্যা এবং সেকশন জাতিসমূহ ব্রিটেনে এসে ইংরেজ জাতির সূত্রপাত করে।

ভাষা কাকে বলে

ভাষা কাকে বলে :

আমাদের একে অপরের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের এবং মনের ভাব বিনিময়ের মাধ্যম-ই হচ্ছে ভাষা। তবে ভাষার সংজ্ঞা এভাবে সহজ ভাষায় দেওয়াটা খুবই দুঃসাধ্য ব্যাপার। কারন পৃথিবীর সকল কিছুর সংজ্ঞা দিতে গেলেই আপনাকে ভাষার ব্যাবহার করতে হবে। আর এই কারনেই ভাষার সংজ্ঞা দেওয়ার প্রকৃত পক্ষেই একটি কঠিন বিষয় হয়ে দাড়ায়। তবে বিভিন্ন ভাষাবিদের মতে ভাষা হলো,

“মানুষের মস্তিস্ক প্রসূত মনের ভাব প্রকাশিত করার জন্য বাক যন্ত্রের মাধ্যমে প্রকাশিত শব্দই হচ্ছে ভাষা। এবং এই ভাষা হচ্ছে মানুষের মধ্যে মত বিনিময় বা অনূভুতি প্রকাশের মাধ্যম। তবে ভাষা যে শুধুমাত্র মৌখিক তা নয় বরং মনের ভাব প্রকাশিত করার জন্য লিখিত ও সাংকেতিক চিহ্নকেও ভাষা বলা হয়”

তবে মনের ভাব প্রকাশিত করার জন্য মানুষই একমাত্র প্রানি যারা মনের ভাব ভাষার মাধ্যমে সম্পূর্ণ রুপে প্রকাশ করতে পারে। পৃথিবীর অন্য কোন প্রানির মাঝে এ ক্ষমতা বিদ্যমান নয়। আবার অঞ্চল ভেদে ভাষার পরিবর্তন দেখা যায়। এবং পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত বহু ভাষা প্রচলিত রয়েছে।

তবে একজন বোবা মানুষ তো কথা বলতে পারে না আবার একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধী কানে শুনতে পায় না তাদের জন্য ভাষা প্রকাশের জন্য রয়েছে সাংকেতিক উপায় এবং লিখিত উপায় সেক্ষেতে এখানে যেহেতু মনের ভাব প্রকাশিত হচ্ছে সেহেতু এটিও ভাষা।

ভাষা হচ্ছে এমন একটি বিষয় যা মানুষ তার পরিবার এবং পরিবেশের কাছ থেকে পেয়ে থাকে। এবং একটি শিশু প্রাকৃতিক নিয়মেই ভাষা শিখে নেয় যার জন্য তার আলাদা কোন চর্চার প্রয়োজন পরে না।

সংস্কৃতি কাকে বলে

সংস্কৃতি কাকে বলে :

আমরা বাঙ্গালী আমাদের আচার অনুষ্ঠান ও রীতি নিতি থেকেই আমাদের আলাদা করে চেনা যায়। যা পৃথিবীর অন্য সকল জাতি বা অঞ্চলের মানুষের থেকে সম্পুর্ন আলাদা। আমাদের রয়েছে বিশেষ কত গুলো আচার অনুষ্ঠান। যে গুলো আমরা নিয়মিত পালন করে থাকি এবং এসকল নিয়ম কানুন বা রীতিনীতি আমরা পেয়েছি আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকে। আর এটিই হলো আমাদের সংস্কৃতি বা কৃষ্টি।

মূলত একটি জাতির বা অঞ্চলের মানুষের পরিচয় তার সংস্কৃতির মাধ্যমেই প্রকাশ পায়। এটি অঞ্চল ভেদে আলাদা আলাদা হয়ে থাকে। এবং এসকল আচার অনুষ্ঠান বা রীতি নিতি আমরা পেয়ে থাকি আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকে। তারা যা পালন করে এসেছে পরবর্তী প্রজন্ম তা বিশ্বাসের সাথে পালন করে থাকে।

তাহলে এসকল বিষয় হতে সংস্কৃতি কাকে বলে এটি সুস্পষ্ট হয়, সংস্কৃতি হলো একটি জাতী বা অঞ্চলের মানুষের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, রীতি নিতি, জীবিকা নির্বাহের উপায়, খাদ্য অভ্যাস, নাচ, গান, সামাজিক নিয়মনীতি, শিক্ষা ইত্যাদি। যা সেই অঞ্চলের বা জাতির মানুষের পরিচয় বহনের একটি মাধ্যম। এবং সংস্কৃতি হচ্ছে একটি বাংলা শব্দ। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো কালচার (Culture)।

বিভিন্ন মনিষীগন এই সংস্কৃতির সংজ্ঞা বিভিন্ন ভাবে দিয়েছেন। স্যামুয়েল পুফেনডর্ফের মতে সংস্কৃতি হলো,
“সংস্কৃতি বলতে সেই সকল পন্থাকে বোঝায় যার মধ্য দিয়ে মানব জাতি তাদের প্রকৃত বর্বরতাকে কাটিয়ে ওঠে এবং ভ্রান্তিমূলক কৌশলের মাধ্যমে পূর্ণরূপে মানুষে পরিণত হয়।”

অপর দিকে একটি অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতি কেমন হবে তা নির্ভর করে ওই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান, আবহাওয়া, বেঁচে থাকার কৌশল ইত্যাদির উপর। এবং তা আরোপিত হয় পূর্বপুরুষদের হতে উত্তরসূরীদের মধ্যে। এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এসকল রীতি নিতি শ্রদ্ধা ভরে পালন করবে এটাই নিয়ম। তবে কিছু ক্ষেত্রে যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে সংস্কৃতিতে নতুন কিছু যোজন বিযোজন হয়ে থাকে। এবং এই ধারা যুগের পর যুগ প্রবাহিত হতে থাকে।

আমার ছেলেবেলা রচনা

আমার ছেলেবেলা রচনা
অথবা, শৈশব স্মৃতি
অথবা, যখন ছোট ছিলাম

[সংকেত: ভূমিকা—শৈশব স্মৃতি বর্তমানের আমি উপসংহার]

ভূমিকা : আজকে যা বা ঘটনা, আগামী দিন তা স্মৃতি। প্রতিটি মানুষের শৈশবের কিছু স্মৃতি তার মনে উজ্জ্বল হয়ে বিরাজ করে। আমার জীবনেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নিজের মনের অজান্তেই মাঝে মধ্যে আমি হারিয়ে যাই আমার শৈশবের ফেলে আসা দিনগুলােতে। আর তখন মনের মাঝে বেদনার একটি হালকা অনুভূতি বয়ে যায়। সত্যিই শৈশব স্মৃতি, স্নেহ-মমতা আর ভালােবাসার উপাদানে গড়া। তাইতাে আমার মন গেয়ে উঠে।

‘একবার যেতে দে না আমার ছােট্ট সােনার গাঁয়
যেথায় কোকিল ডাকে কুহু
দোয়েল ডাকে মুহু মুহু
নদী যেথায় ছুটে চলে আপন ঠিকানায়।”

শৈশব সৃতি : আমার শৈশবকালের পুরােটাই কেটেছে গ্রামে। বাবা, মা, ভাইদের পরম যত্নে আমার শৈশব কাল ছিল সত্যিই অন্য রকম। আমার গ্রামের নাম বল্লা। এটি কালিহাতী উপজেলার একটি ইউনিয়ন । একটি গ্রাম হলেও অনেকটাই শহুরে ধাঁচে গড়ে উঠেছে গ্রামটি। তাই এখানে রয়েছে বৈচিত্র্য । প্রথমেই আমার শৈশবের স্কুলজীবনের সূচনার কথা বলি। তখন আমি সবে মাত্র ‘পুস্তক’ বই (মদন মােহন তর্কালঙ্কারের) শেষ করেছি। স্কুলে যাবার প্রবল আগ্রহ কিন্তু বয়সের কারণে স্কুলে যেতে পারছি না। এ অবস্থায় আমার মেজ ভাইয়ের শিক্ষক রশীদ স্যারকে মা জানালেন আমার স্কুলে পড়ার আগ্রহের কথা। আমার বাড়ির সাথেই যে গার্লস হাই স্কুল আছে তারই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তিনি। তিনি রাজি হলেন এবং দুই টাকা ফি দিয়ে পরীক্ষা দিতে বললে আমি তাই করলাম। জীবনের প্রথম স্কুলে যাওয়া এবং প্রথম পরীক্ষা। অসাধারণ এক অনুভূতি নিয়ে পরীক্ষা দিলাম। ফল প্রকাশিত হলে আমি প্রথম হলাম। তখন যে কি আনন্দ লাগছিল তা ভাষায় বােঝানাে সম্ভব নয়। এর কিছুদিন পর আমাদের বাজারের স্কুল যার নাম বল্লা করােনেশন উচ্চ বিদ্যালয় এখানে একটি নাটক মঞ্চায়ন হয়। নাটকের নাম ছিল প্রতিশােধ’ । আমি ঐ নাটকে মােহনের অভিনয় করি। জীবনের প্রথম অভিনয় এতটাই ভালাে হয়েছিল যে আজও তা মনে পড়ে।

আসলে আমার শৈশবের বেশির ভাগ সৃতিই নানার বাড়ির সাথে জড়িত। যদিও আমি নানাকে পাইনি তবে নানি ও মামা-খালাদের পেয়েছি যথার্থ ভাবে। নানি আমাকে খুব আদর করতেন। সবার চোখের আড়ালে তিনি আমাকে বিভিন্ন মজাদার খাবার খেতে দিতেন। শুধু তাই নয়, আমার পরীক্ষায় ভালাে ফলাফলের জন্য তিনি আমাকে পাঁচ’শ টাকাও দেন আংটি গড়ার জন্য। আজ নানি নেই কিন্তু আমার স্মৃতিতে সেসব দিনের কথা আজও অম্লান।

আমার শৈশবের আরেকটি স্মৃতির কথা উল্লেখ করেই এ লেখার সমাপ্তি টানতে চাই। সে ঘটনাটি আমার দাদার বাড়ি। ঈদ উপলক্ষে বরাবরই বাবা বড় আকারের একটি খাসি কিনতেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা এলাকার সর্ববৃহৎ হতাে। আমি সেবার ছাগল কিনে আনার পর তা নিয়ে পাড়ায় বের হয়েছি বন্ধুদেরকে দেখানাের জন্য। হঠাৎ আমার কাছ থেকে ছাগলটি প্রচণ্ড শক্তিতে ছুটে যায় । আমি বহু চেষ্টা করেও ওটাকে ধরে রাখতে পারিনি। অবশেষে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি আসি। সবাই বিষয়টি বুঝতে পেরে ছাগল খুঁজতে বের হয়। দুই দিন পর ছাগলটির সন্ধান মেলে। এসব স্মৃতি ছাড়াও আরাে বহু স্মৃতি মনকে নাড়া দেয়।

বর্তমানে আমি : বর্তমানের এ আমাকে অনেক অচেনা মনে হয়। মনে হয় অনেক বেশি যান্ত্রিক হয়ে গেছি। এরপরও যখন গ্রামে যাই তখন পুরনাে বটগাছটির নিচে অন্তত একবার হলেও দাঁড়াই। কল্পনায় আপনা আপনিই হারিয়ে ফেলি নিজেকে। মনে হয় এখনও সেই ফেলে আসা দিনের কোনাে এক বিকেলে দাঁড়িয়ে আছি বটতলায়। বন্ধুরা সব মনের আনন্দে দাড়িয়াবাধা খেলছে। আমি অপেক্ষায় আছি পরের পর্ব থেকে খেলার জন্যে কিংবা এঁটেল মাটির ছােট ছােট গােলা তৈরি করে তা বটতলায় বসে আগুনে পোড়াচ্ছি সব বন্ধুরা মিলে। পরক্ষণেই যখন বাস্তবে ফিরে আসি তখনই বুকটাতে হালকা এক দুঃখানুভূতি বয়ে যায়। মনে হয় যদি ফিরে যেতে পারতাম শৈশবের সেই দিন গুলােতে।

উপসংহার : কালের যাত্রায় সবকিছুই পাল্টে যায়। আমার জীবনেও শৈশব, কৈশাের পেরিয়ে গেছে বহু আগে। কিন্তু ফেলে আসা দিন গুলাের হাজারাে ঘটনার কিছু কিছু চিত্র কখনাে ভােলা যায় না। মনের অজান্তেই সেগুলাে মনের আয়নায় ভেসে ওঠে, আর তখন তৃষ্ণার্ত মন ফিরে পেতে চায় হারানাে শৈশব। কিন্তু তা সম্ভব নয়। তাইতাে কবি গুরুর ন্যায় আমারও বলতে ইচ্ছে হয়-
“দিনগুলি মাের সােনার খাঁচায় রইল না রইল না
সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।”

শিশুদের বঙ্গবন্ধু রচনা

শিশুদের বঙ্গবন্ধু রচনা

ভূমিকা: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে বলা হয় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী। তিনি বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন মহান নায়ক। বাঙালি জাতি আজও বিশ্বাস করেন শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম না হলে হয়ত বাংলাদেশ আজও স্বাধীন হতে পারতে না। আর এ কারনেই তাকে “জাতির পিতা” বলা হয়। তিনি একদিকে যেমন একজন সফল নেতা তেমনি তার ভিতরে অন্য সকল গুণাবলিই বিদ্যমান। তিনি শিশুদের অত্যন্ত ভালবাসতেন। এবং শিশুদের মমতা ও স্নেহ করতেন। একই সাথে তিনি ছোট ছোট শিশুদের সাথে সময় কাটাতে খুবই ভালবাসতেন। এ কারনেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম দিন ১৭ মার্চ তারিখকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এবং এই শিশু দিবসে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম দিন এবং শিশু দিবস হিসেবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবনী: ১৭ মার্চ তারিখে ১৯২০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শেখ লুৎফর রহমান এবং মাতার নাম সায়েরা খাতুন। ছয় ভাই বোনের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তৃতীয়। তার স্কুল জীবন শুরু হয় গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার মধ্যে দিয়ে ১৯২৭ সালে। এবং গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে পড়ালেখা করার সময় থেকেই তার ভিতরে নেতৃত্বের মনোভাব সৃষ্টি হয়। ছোট বড় সকলের জন্যই তার হৃদয় ছিল মায়ায় ভরা। তিনি যখন বিভিন্ন কাজে গ্রামে গঞ্জে যেতেন তখন গাড়ি থামিয়ে ছোট ছোট শিশুদের সাথে তিনি গল্প করতেন। এবং বিভিন্ন উপহার দিয়ে শিশুদের মুখে হাসি ফুটাতেন তিনি। তবে ১৯৭৫ সালে আগষ্টের ১৫ তারিখে কিছু নর পশু এই মহান নেতাকে সপরিবারে হত্যা করে।

শিশুদের বঙ্গবন্ধু: বঙ্গবন্ধু সবসময় শিশুদের অনেক ভালবাসতেন তা তার ব্যাবহার থেকেই সুস্পষ্ট বোঝা যায়। তিনি তার কর্মব্যস্ত জিবনে শিশুদের সাথে সময় কাটাতে খুবই ভালবাসতেন। এবং বিভিন্ন সময় শিশুদের নিয়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন আয়োজনে অংশগ্রহণ করতেন। তিনি যখন গ্রামে ফিরতেন তখন পথে শিশুদের সাথে দেখা হলে গাড়ি থামিয়ে তাদের সাথে কথা বলতেন। তাদের মাঝে নিজেকে ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করতেন। এছাড়াও তিনি শিশুদের বিভিন্ন উপহার সামগ্রি প্রদান করতেন তাদের মুখে হাসি ফোটাতে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরে কচি-কাঁচার মেলা আয়োজিত শিশু আনন্দ মেলায় এসেছিলেন ১৯৬৩ সালে সে সময় তিনি বঙ্গবন্ধু উপাধি হয়তো পেয়েছিলেন না কিন্তু তৎকালীন সময় তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের একজন বড় মাপের নেতা। তিনি তখন সেখানে শিশুদের জন্য ক্ষুদে বক্তব্য প্রদান করে। যার থেকে খুব সহজেই স্পষ্ট হয়ে যায় তিনি শিশুদের কতটা ভালবাসতেন সে বিষয়ে। তিনি তখন বলেছিলেন, “এই সকল পবিত্র শিশুদের সঙ্গে মিশি মনকে হালকা করার জন্য”

এরপরে তিনি যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন তখন সময়টা ছিল ১৯৭২ সাল। এ সময়ে কেবল মুক্তি যুদ্ধ শেষ হলো। তখনকার শিশুরাও ছিল এ যুদ্ধের প্রতক্ষ্যদর্শী। সে সময়ে কচিঁ কাচাঁর মেলার কিছু ক্ষুদে শিশুরা মুক্তিযুদ্ধের ৩০০ টি ছবি আঁকে বঙ্গবন্ধুকে দেখাবে বলে। এর থেকে ৭০ টি ছবি বাছাই করে শেখ মুজিবুর রহমান-কে দেখানো হয়। তিনি প্রতিটি ছবি মনোযোগ সহকারে দেখেছিলেন এবং সেসকল শিশুদের প্রশংসা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন আমাদের দেশের শিশুরা এতো সুন্দর ছবি আঁকতে পারে এ সকল ছবি না দেখলে জানাতেই পারতাম না। এবং তিনি বললেন এই ছবিগুলো আমি রাশিয়া সফরে যাওয়ার সময় সাথে করে নিয়ে যাবো সে দেশের শিশুদের জন্য শুভেচ্ছা উপাহার হিসেবে।

শিশুদের প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে এবং শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের ২২ জুন জাতীয় শিশু আইন (চিলড্রেন অ্যাক্ট) জারি করেন। যার ফলে শিশুরা তাদের প্রাপ্ত অধিকার পেতে পারে তা নিশ্চিত করতে। এছাড়াও শিশুদের জন্য তিনি আরো অনেক কাজ করে গিয়েছিলেন যা বলে শেষ করার মত নয়। এ কারনেই মুলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন কে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকার। যার ফলে শিশুদের মাধ্যমে তার জন্মদিনকে চিরস্মরণীয় করে রাখা সম্ভব হয়।

উপসংহার: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একদিকে যেমন ছিলেন একজন ক্ষমতাধর সুযোগ্য নেতা তেমনি ছিলেন একজন নির্মল হৃদয়ের অধিকারী মানুষ! আর তার এই বড় মনের প্রকাশ ঘটেছে তার নেতৃত্ব এবং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বিভিন্ন সময়। একই সাথে তার এই শিশুদের সাথে মেলা মেশা ও তার বৃহৎ হৃদয়ের পরিচয় দেয়। তিনি ছিলেন একদিকে যেমন অন্যায়োর সাথে আপোষ হীন নেতৃত্ব তেমনি ছিলেন শিশুদের বন্ধু!

ক্রিকেট রচনা

ক্রিকেট রচনা

রচনাঃ ক্রিকেট
অথবাঃ ক্রিকেট ও বাংলাদেশ
অথবাঃ বাংলাদেশ ক্রিকেট রচনা

(সংকেত: ভূমিকা- উৎপত্তি- খেলার নিয়ম-বিশ্বকাপে বাংলাদেশ – বাংলাদেশের সাফল্য -উপসংহার)

ভূমিকা : ক্রিকেট একটি বিদেশি খেলা হলেও দিন দিন আমাদের দেশে এর জনপ্রিয়তা বেড়ে চলেছে।পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষের প্রিয় খেলা ফুটবল ক্রিকেট, একথা বলা শক্ত। বিশ্বকাপ ফুটবলের মতাে এটিরও বিশ্ব আসর বসে। সারা দিনব্যাপী এ খেলা উপভােগের মজাই আলাদা।

উৎপত্তি : ক্রিকেট খেলার উৎপত্তি হয় ইংল্যান্ডে। সে সময় ইংল্যান্ডে স্টু’ বল নামে এক রকম খেলার উৎপত্তি ছিল। সেখান থেকে পরবর্তীতে ক্রিকেট খেলার জন্ম হয়। বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলা শুরু হয় ১৯৭৫ সাল থেকে। সেই থেকে ক্রিকেট আজ বিশ্বের বহু দেশের প্রাণের খেলা। প্রতি চার বছর পর পর বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আসর বসে।

খেলার নিয়ম : ক্রিকেট খেলার জন্য প্রথমেই দরকার একটি বড় মাঠ। মাঠের মাঝখানে ২২ গজ জায়গায় পিচ করা থাকে। এর দুই প্রান্তে ২৭/২৮ ইঞ্চি উঁচু তিনটি কাঠের লাঠি একসাথে মিলিয়ে ৮ ইঞ্চি চওড়া করে তৈরি করা হয় উইকেট। তার ওপর ৪ ইঞ্চি লম্বা দুই টুকরাে শক্ত কাঠ আলগা করে চাপানাে থাকে, তাকে বলা হয় বেল। দুই দিকের উইকেটের দু’পাশে এক লাইনে ৪ ফুট করে একটি সােজা দাগ কাটা থাকে যাকে বলে বােলিং ক্রিজ’। উইকেট থেকে ৪ ফুট এগিয়ে আরেকটি যে সমান্তরাল দাগ থাকে তাকে ‘পপিং ক্রিজ’ বলে । খেলা শুরুর জন্য মাঠে প্রথম পক্ষের দুজন খেলােয়াড়, অন্য পক্ষের ১১ জন এবং দুজন আম্পায়ার সহ মােট ১৫ জন অবস্থান করে। প্রথমে প্রথম পক্ষের দুজন খেলােয়াড় দুটি ব্যাট হাতে নিয়ে দুই প্রান্তের পপিং ক্রিজে এসে দাঁড়াবে। ব্যাটটির হাতল ১-৪ ইঞ্চি লম্বা হয়। যে বল ছােড়ে তাকে বলে বােলার। যে ব্যাট দিয়ে বল মারে তাকে ব্যাটসম্যান বলে। বল করার জন্য উইকেটের পেছনে যে দাঁড়াবে তাকে বলে উইকেট কিপার। এছাড়া বাকি নয় জন খেলােয়াড় মাঠে থাকে যাতে করে বিপরীত দলের যে খেলােয়াড় ব্যাট দিয়ে বলটাকে মারল তা যেন বেশি দূর না যেতে পারে। এদের ফিল্ডার বলা হয়। ফিল্ডাররা বল ছুড়ে দেবার আগে ব্যাটসম্যান নিজেদের জায়গা বদল অর্থাৎ এক পপিং ক্রিজ থেকে অন্য প্রান্তের পপিং ক্রিজে যাওয়াকে রান’ বলে। যতবার দুই ব্যাটসম্যান জায়গা বদল করে তত রান হয়। ব্যাটসম্যান যে বলটি মারল তা যদি ফিল্ডাররা না ঠেকাতে পারে মাটিতে গড়িয়ে গড়িয়ে মাঠের চারপার্শ্বে চিহ্নিত বৃত্তাকার দাগের বাইরে চলে যায় তবে পপিংক্রিজ বদল না করলেও ৪ রান হয়। আর বল যদি উড়ে গিয়ে বৃত্তাকার চিহ্নের বাইরে চলে যায় তখন হয় ৬ রান, যাকে বলে ছক্কা। কেউ একা ১০০ রান করলে হয় সেঞ্চুরি। আর পঞ্চাশ রান করলে হয় হাফ সেঞ্চুরি। যে দল যত বেশি রান করে সেই দলই জয়ী হয়।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশ : আইসিসি-র নিয়ম মােতাবেক এক এক সময় এক এক দেশে বিশ্বকাপ ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হয়। এ হিসেবে শতাব্দীর শেষ বিশ্বকাপ ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হয় ক্রিকেটের জন্মভূমি ইংল্যান্ডে। এতে ১২টি দল অংশ নেয়। এ বিশ্বকাপে দুটি দল যােগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তারা হলাে- নেদারল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এদের স্থানে আসে অপরাজিত আইসিসি চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ এবং স্কটল্যান্ড। অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানের মধ্যে ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয়। মাত্র ১৩২ রানে অল আউট হয়ে যায় পাকিস্তান। সুতরাং শিরােপা আসে অস্ট্রেলিয়ার হাতে। ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কৃতিত্ব আরাে সমৃদ্ধি লাভ করে। দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার স্বপ্ন নিয়ে ডেভ হােয়াটমােরের প্রশিক্ষণে মাশরাফি, আশরাফুল, তামিম ওয়েস্ট ইন্ডিজে যায়। বিশ্ব কাপের প্রথম খেলাতেই বিশ্ব ক্রিকেট বােদ্ধাদের বাংলাদেশের ক্রিকেট শক্তির পরিচয় দেয় ভারতকে ৫ উইকেটে হারিয়ে দিয়ে। শক্তিশালী দক্ষিণ আফ্রিকাকে পরাজিত করে বাংলাদেশ তাদের শক্তির আরাে একবার প্রমাণ দেয়। অপ্রত্যাশিত ভাবে আয়ারল্যান্ডের কাছে পরাজয় বাংলাদেশের বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউড়ে ওঠার স্বপ্ন শেষ করে দেয়। ২০১১ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কাতে। অনুকূল আবহাওয়া, পরিচিত পরিবেশ সবকিছু মিলিয়ে আশা করা যায় বাংলাদেশ আরাে অনেক ভালাে খেলা উপহার দিবে।

বাংলাদেশের সাফল্য : ক্রিকেটে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অতি উজ্জ্বল। আইসিসিতে বাংলাদেশ অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হবার গৌরব অর্জন করে ‘৯৯-এর বিশ্বকাপ ক্রিকেটে অংশ নেয়। একটি খেলায় বাংলাদেশ বিশ্ব সেরা দেশ পাকিস্তান কে হারায় ৬২ রানে। ২০০০ এ বাংলাদেশ টেস্ট খেলার মর্যাদা লাভ করে। সরকার ও জনগণ খুব আন্তরিক ক্রিকেটের জন্য। এখন খেলােয়াড়রা আন্তরিক হলেই আমরা যে বিজয়ের জাতি তা আবারও প্রমাণিত হবে। ২০০৯ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে বাংলাদেশ বিদেশের মাটিতে ক্রিকেট শক্তির বড় ধরনের প্রমাণ রাখে। গ্রেনেডা ও সেন্ট ভিনসেন্ট টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পরাজিত করে বাংলাদেশ। প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে তামিম ইকবালের সেঞ্চুরি ও জুনায়েদ সিদ্দিকীর ৭৮ রানে বাংলাদেশের ২৭৬ রানের লিড হয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১৮১ রানে গুটিয়ে দিয়ে দেশের বাইরে প্রথম টেস্ট জয়ের নেতৃত্ব দিলেন স্পিনাররা। ৫ উইকেট নিয়ে পুরােভাগে ছিলেন মাহমুদ উল্লাহ। বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশ তার শক্তিকে আরাে একবার প্রমাণ করল ২০১০ সালে নিউজিল্যান্ড কে হােয়াইটওয়াশ করে। ৫ ম্যাচের সিরিজে একটি খেলা বৃষ্টির কারণে অনুষ্ঠিত হয়নি বলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৪-০। মাশরাফি তামিমের অসুস্থতা থাকার পরেও অধিনায়ক সাকিব সহ ইমরুল কায়েস, শাহারিয়ার নাফিজের ব্যাটিং-এর সাথে সাথে রুবেল, শুভ, রাজ্জাক, সাকিবের বােলিং বাংলাদেশের জয়ের পথকে সহজ করে। অসাধারণ নৈপুণ্যের কারণে সিরিজ সেরা নির্বাচিত হন অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। শক্তিশালী নিউজিল্যান্ডকে পরাজিত করে ২০১১ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নিজেদেরকে শক্তিশালী দলে পরিণত হবার ইঙ্গিত বহন করে।

উপসংহার : আমাদের দেশের খেলাধুলার মধ্যে ক্রিকেটের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এশিয়াতেই ক্রিকেট বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ আয়ােজক দেশগুলাের একটি। বিভিন্ন প্রতিযােগিতামূলক টুর্নামেন্ট আয়ােজনে বাংলাদেশের অতীত সাফল্য বাংলাদেশ কে বিশ্বের দরবারে আরাে পরিচিত করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় ক্রিকেট বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এদেশের ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। তাছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাম্প্রতিক কালের সাফল্যও ঈর্ষনীয় । ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের অভিমত আসন্ন বিশ্বকাপেও তারা ভালাে ফলাফল করবে।